সাভারে ডাকাত সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন ছয় ছাত্র। পুলিশ বলছে, এলাকাবাসীর উত্তেজনার কারণে কিছু করা যায়নি।
সোমবার ভোররাতে সাভারের আমিনবাজারের বড়দেশী এলাকার কেবলার চরে স্থানীয়দের পিটুনিতে ছয় ছাত্র নিহত হন। এরা হলেন, ইব্রাহিম খলিল (স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষ-বাংলা কলেজ), তৌহিদুর রহমান পলাশ (স্নাতক তৃতীয় বর্ষ-বাংলা কলেজ), কামরুজ্জাম কান্ত (স্নাতক প্রথম বর্ষ-বাংলা কলেজ), টিপু সুলতান (স্নাতক প্রথম পর্ষ তেজগাঁও সরকারি কলেজ), শামস্ রহিম শাম্মাম ( 'এ' লেভেল-মাস্টারমাইন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ) ও মনির সেতাফ (বিবিএ-বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব বিজনেস অ্যান্ড টেকনোলজি)।
তাদের সবার বাসা মিরপুরের দারুস সালাম ও শ্যামলী এলাকায়। নিহতদের লাশ পরিবারকে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এ ঘটনার পর মিরপুর সড়কে হয়েছে বিক্ষোভ। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে দুটি। পাঁচ-ছয়শ জনকে আসামি করে একটি হত্যামামলা করেছে পুলিশ। অপর মামলাটিতে ডাকাতির অভিযোগ এনে নিহত ছয় ছাত্রসহ ১৫/২০ জনকে আসামি করেছেন স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক।
ঘটনাস্থল থেকে দুটি রাম দা, দুটি চাপাতি ও দুটি ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে বলে দাবি করেছে পুলিশ। তবে হামলায় বেঁচে যাওয়া যুবক আল-আমিন বলেছেন, তাদের কাছে কোনো অস্ত্র ছিলো না।
মাদার ফুট ওয়্যারের বিক্রয় প্রতিনিধি আল-আমিন জানান, তারা মাদক সেবন করতে ওই এলাকায় গিয়েছিলেন।
যেভাবে ঘটনা ঘটলো
আল-আমিন জানান, তার বাড়ি মাদারীপুর জেলার শিবচর থানার শিপার পাড় এলাকায়। মাদার ফুট ওয়্যারের বিক্রয় প্রতিনিধি তিনি। নিহত ছয় জনই তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
আল-আমিন ও তার ছয় বন্ধু রোববার রাতে রিকশা করে দারুসসালাম থেকে পর্বত সিনেমা হলের সামনে নামেন। পরে পায়ে হেঁটে গাবতলী ব্রিজ পার হয়ে বড়দেশী বালুর মাঠে তারা মাদক সেবন করেন বলে জানান আল-আমিন।
তিনি বলেন, "হঠাৎ করেই অনেকগুলো টর্চের আলো দেখতে পাই। প্রথমে মনে হয়েছিলো ট্রাক আসছে। পরে দেখি অনেক মানুষ এক সঙ্গে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুরু হলো মারধর।
"এক পর্যায়ে আমি এক মুরুব্বির পায়ে ধরে বলি- আমরা ডাকাত না, ঘুরতে এসেছি। তবে ওই মুরুব্বি নির্দয়ভাবেই আমাকে মারতে থাকেন। এরপর আমি আরেক মুরুব্বির পায়ে ধরে বলি- চাচা আমাকে বাঁচান। ওই চাচার হাত থেকে রেহাই না পেয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এক দারোগার পায়ে ধরি। তখন দারোগাকে বলতে শুনি- আপনারা সবাইকে মেরে ফেললে তো সমস্যা হয়ে যাবে। একজনকে বাঁচিয়ে রাখেন।"
পুলিশের ওই কথায়ই মূলত তিনি বেঁচে গেছেন বলে মনে করেন আল-আমিন।
পুলিশের সামনে আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে সাভার মডেল থানার ওসি মাহবুবুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দূরে অন্য একটি অভিযানে ছিলো। ঘটনার শেষ পর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা সেখানে পৌঁছে। এলাকাবাসীর উত্তেজনার কারণে আমাদের কিছু করার উপায় ছিলো না।"
পুলিশের বক্তব্য
সাভার মডেল থানার উপ-পরিদর্শক আমিনুর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, রাত আনুমানিক পৌনে ২টার দিকে ওই এলাকায় সাত সদস্যের এক দল ডাকাত ধারালো অস্ত্র-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ডাকাতির প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। স্থানীয়রা বিষয়টি আঁচ করতে পেরে একত্রিত হয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই ছয় জনের মৃত্যু হয়। অন্যজনকে আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার করে সাভার থানা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে ভর্তি করা হয়।
ঘটনাস্থল থেকে দুটি রাম দা, দুটি চাপাতি ও দুটি ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে বলেও দাবি করেন পুলিশ কর্মকর্তা আমিনুর।
আলাউদ্দিন নামে আমিনবাজারের স্থানীয় এক ব্যক্তি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, "আমরা ডাকাতের অত্যাচারে অতিষ্ঠ। প্রতিদিন ট্রলারে করে ডাকাত দল এসে ডাকাতি করছে। ঘটনার সময়ও ঘাটে একটি ট্রলার থেমে থাকতে দেখেছি। এলাকাবাসী এগিয়ে গেলে সেটি দ্রুত ঘাট থেকে সটকে পড়ে।"
ওই ছয় যুবক ঘটনায় ডাকাত ছিলেন কি না- তা নিয়ে তিনিও সন্দেহ প্রকাশ করেন।
নিহতদের আত্মীয়ের বক্তব্য
নিহত ইব্রাহিমের চাচা আব্দুল বারেক জানান, দুই ভাইবোনের মধ্যে সে ছিলো বড়। তার বাবা আবু তাহের কল্যাণপুরে ফলের ব্যবসা করেন। মাদারীপুরের কালকিনির পূর্ব খানদলীর কাজিবাঁকাই গ্রামে তাদের পৈত্রিক নিবাস।
আবু তাহের বলেন, "অনেক কষ্ট করে ছেলের কলেজের পড়াশোনা চালিয়ে যাচ্ছিলাম। গতকাল রাত ১২টার দিকে পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে নামাজের জন্য বের হয়। আর আজ ফিরলো লাশ হয়ে...।"
শামসের আত্মীয় রিফাত শাহরিয়ার বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, সে খুবই মেধাবী ছিলো। পড়াশোনা পাশাপাশি খেলাধুলায়ও ছিলো বেশ ঝোঁক। ডাকাতি করার তো প্রশ্নই আসে না।
হত্যা ও ডাকাতির দুই মামলা
গণপিটুনিতে ছয় ছাত্রের মৃত্যুর ঘটনায় একটি ডাকাতির এবং একটি হত্যামামলা হয়েছে। পুলিশের দায়ের করা হত্যা মামলায় পাঁচ থেকে ছয়শ' জনকে আসামি করা হয়েছে। বাদী হয়েছেন উপ-পরিদর্শক (এসআই) আনোয়ার হোসেন।
অপর মামলাটিতে ডাকাতির অভিযোগ এনে নিহত ছয় ছাত্রসহ ১৫/২০ জনকে আসামি করেছেন স্থানীয় বালু ব্যবসায়ী আব্দুল মালেক। তার দাবি, পিটুনিতে নিহত হওয়ার আগে ওই যুবকরা ছোরা দেখিয়ে পাঁচ হাজার টাকা ছিনিয়ে নিয়েছিলো।
মিরপুরে বিক্ষোভ, তদন্তের আশ্বাস
এলাকার ছেলের মৃত্যুর খবর শুনে বেলা সাড়ে ১২টার দিকে দারুস সালাম এলাকার কয়েকহাজার লোক মিরপুর সড়কে অবস্থান নেয়। এতে শ্যামলী থেকে গাবতলীর আগে টেকনিক্যাল মোড় পর্যন্ত সড়কে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বিক্ষোভের খবর পেয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আসলামুল হক ও ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর অঞ্চলের উপকমিশনার ইমতিয়াজ আহমেদ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই ঘটনা তদন্তের আশ্বাস দেন। আশ্বাস পেয়ে দুপুর ২টার দিকে জনতা রাস্তা ছেড়ে দেয়।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন