সাইফুল ইসলাম
বিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে লভ-ক্ষতি কী হল? আওয়ামী লীগের কাছে সবটুকুই লাভ, আর বিরেধীদের কাছে সবটুকুই ক্ষতি। কিন্তু বাস্তবে কী হল? প্রথমত এর মাধ্যমে কাউকেও খুশি করা গেল না। বিএনপি ও সমমনা দলগুলো নাখুশ হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার কারণে। ইসলামপন্থী দলগুলো নাখুশ হয় সংবিধানের শুরু থেকে “সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস” কথাটি বিলুপ্ত করার কারণে। বামপন্থীরা নাখুশ হয় সংবিধানে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্মইসলাম ও ধর্মীয় রাজনীতি বহাল রাখার কারণে। উপজাতিরা নাখুশ হয় তাদেরকে আদিবাসী স্বীকৃতি না দেয়ার কারণে। মানচিত্র ভিত্তিক পরিচয় বাংলাদেশী জাতীয়তাকে খাট করে ভাষা ভিত্তিক পরিচয় বাঙ্গালী জাতীয়তাকে প্রাধান্য দেয়ায় অবাঙ্গালীরা নিজেদেরকে ২য় শ্রেণীর নাগরিক মনে করতে বাধ্য হচ্ছে। ফলে শেখ মুজিব কর্তৃক “তোরা সব বাঙ্গালী হয়ে যা” বলে পার্বত্য চট্টগ্রামে যে বিচ্ছিন্নতার বীজ বপন করা হয়েছিল তার ফল ভোগ করার জন্য শেখ হাছিনা কর্তৃক আবার তাদেরকে বাঙ্গালী-উপজাতি প্রশ্নে সংঘাতের দিকে ঠেলে দেয়া হয় এবং এতে করে আরেকটি পূর্ব তিমুর বা দক্ষিণ সুদান সৃষ্টির পথ সুগম হল। এতে জাতি হল বিভক্ত, দেশ হল অস্থিতিশীল। অন্যদিকে ট্রানজিট পাওয়ার পর ভারতের কাছে এবং গ্যাসব্লক পাওয়ার পর আমেরিকার কাছে এ মুহুর্থে আওয়ামী লীগ আর অপরিহার্য নয়। তাই দেশে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা কমলে তাতে তাদের লাভ ছাড়া কোন ক্ষতি নেই। কারণ তখন তাকে দিয়ে আরো কিছু আদায় করা যাবে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার নাম ঠিক রেখেই প্রয়োজনীয় অন্তর্বর্তী নিয়মাবলী পরিবর্তন করলে বিএনপি বিরোধীতা করে সুবিধা করতে পারত না। বামপন্থীদেরকে অবজ্ঞা করে সংবিধানে বিসমিল্লাহ, রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম ও ধর্মীয় রাজনীতি রাখতে পারলে সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রাখলে এমন কি সমস্যা হত? অন্তত ইসলামপন্থীরা নাখুশ হতনা এবং আওয়ামী লীগকে তাওহীদ বিরোধী বলতে পারত না। একমাত্র বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদ বললে এ দেশের কেউ নিজেদেরকে সংখ্যালঘু ভাবতে পারত না এবং অন্য দেশের বাঙ্গালীরা আমাদের জাতীয়তায় ভাগ বসাতে পারত না। এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিষয়টি দলীয়, আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস বিষয়টি ধর্মীয় এবং জাতীয়তাবাদ বিষয়টি রাষ্ট্রীয় ঐক্য ও সংহতির সাথে জড়িত। রাষ্ট্র না থাকলে রাষ্ট্রধর্ম-বিশ্বাস কোথায় থাকবে? তাই দেশের ঐক্যের জন্য সকল উপজাতি, আদিবাসী ও সংখ্যালঘুদের সাথে নিয়েই জাতীয় পরিচয় একমাত্র রাষ্ট্র ভিত্তিক বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ করার জন্য আন্দোলন করা আবশ্যক। ধর্ম ভিত্তিক পাকিস্তান হয়েছে, ভাষা বিত্তিক বাংলাদেশ হয়েছে, এখন রাষ্ট্র ভিত্তিক শক্তিশালী হতে হবে। অন্য কোন পরিচয়ে এ রাষ্ট্রের ঐক্য ধরে রাখা সম্ভব হবে না।
দেশের ঐক্য ও সংহতির জন্য আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত-মায়ানমার ও নিকটবর্তী রাষ্ট্র চীনের দিকে নজর দেয়া দরকার। পশ্চিমা সহযোগিতায় পার্বত্য চট্টগ্রাম ও ককসবাজার নিয়ে একটি পৃথক খ্রীষ্টান রাষ্ট্র সৃষ্টি হলে চীনের উপর খরবদারী ছাড়াও ভারতের সেভেন সিস্টার ও মায়ানমারের আরাকান স্বাধীন হওয়ার পথ পরিস্কার হবে। তাই বাংলাদেশ, ভারত, মায়ানমার ও চীনের স্বার্থেই এ এলাকায় কোন বিচ্ছিন্নতাবাদকে সমর্থন করা যাবে না। বাংলাদেশের সাথে চীনের কোন সমস্যা নেই। মায়ানমারের সাথে রুহিঙ্গা স্বরণার্থী ছাড়া আর কোন সমস্যা নেই। ভারতের সাথে সমস্যার অন্ত নেই। মায়ানমারের সাথে সুসম্পর্ক বৃদ্ধি ও রুহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ অর্থ বিনিয়োগ করে রুহিঙ্গা শরণার্থীদেরকে শ্রমীক হিসেবে নিয়োগ করে মায়ানমারের পতিত জমিগুলো চাষ করলে প্রত্যেকের সমস্যা সমাধান হয়ে যায়। সীমান্তে অপর দেশ কাঁটা তারের বেড়া দিলে তাতে আমাদের কোন সমস্যা নেই। কিন্তু লক্ষ্য রাখতে হবে যে, তা যেন আমাদের সীমানার মধ্যে না পড়ে এবং তাতে যেন কোন গোপন দরজা না থাকে। ভারতের সাথে সমস্যার সমাধান করতে হলে যার যার প্রাপ্য অধিকার তাকে দিতে হবে। বন্ধ করতে হবে আমাদের নদীর পানি আটকানো, সীমান্ত হত্যা, চোরাচালান ও মাদক পাচার এবং দূর করতে হবে বাণিজ্যিক ও মিডিয়া প্রতিবন্ধকতা। বাংলাদেশের উপর দিয়ে ফ্রী ট্রানজিট চায়লে ভারতের উপর দিয়েও আমাদেরকে ফ্রী ট্রানজিট দিতে হবে সার্কভুক্ত রাষ্ট্রসমূহে ও চীনে যাতায়াতের জন্য। ভারতের সাথে ভারসাম্য বজায় রাখতে এবং মায়ানমারের সাথে মধ্যস্থতা করতে চীনের সাথে আমাদের গভীর সম্পর্ক রাখতে হবে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রযুক্তিগত ভাবে। যাতে যে কোন অযুহাতে আমেরিকা আমাদের সাথে পাকিস্তানের মত আচরণ করলে তখন আমরা যেন বন্ধুহীন হয়ে না পড়ি।
সাধারণত বন্ধুত্ব হয় সমানে সমানে। শত্র“তা হয় স্বার্থদ্বন্দের কারণে। সম্পর্ক হয় মন, কর্ম বা বিশ্বাসের মিল থাকলে। ধর্মবিশ্বাসগত মিল আছে হিন্দু ও বৌদ্ধদের মধ্যে। জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় চারিত্রিক মিল আছে হিন্দু ও খ্রীষ্টানদের মধ্যে। ধর্মীয় স্পর্শকাতর অনুভূতিগত মিল আছে হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে। মনের মিল আছে বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে। আহ্লে কিতাব হিসেবে মিল আছে খ্রীষ্টান ও মুসলিমদের মধ্যে। আন্তর্জাতিক ভাবে বর্তমানে হিন্দু ও খ্রীষ্টানদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় ঐক্য অতি স্বাভাবিক বিষয়। তেমনি বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যেও রাষ্ট্রীয় ভাবে ঘনিষ্ট বন্ধুত্ব হতেই পারে। জাতীয় ভাবে ঐক্য হতে পারে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, মুসলিমদের মধ্যে। ধর্মীয় ভাবে প্রত্যেক জাতি প্রথমে নিজেদের মধ্যেই এক হতে পারলে বিশ্বব্যাপী সংঘাত অনেক কমে যাবে। যেমন হিন্দুদের মধ্যে আছে ব্রাম্মন, ক্ষত্রীয়, বৈশ্য ও সুদ্র। বৌদ্ধদের মধ্যে হীনযানপন্থী ও মহাযানপন্থী। খ্রীষ্টানদের মধ্যে ক্যাথলিক, অর্থোডক্স ও প্রোটেস্টেন্ট। মুসলিমদের মধ্যে শিয়া-সুন্নি। এর মধ্যে শুধুমাত্র হিন্দুদের বিভাজনটা ইয়াহুদীদের মত বংশগত, যা পরিবর্তনযোগ্য নয়। কিন্তু অন্যদের বিভাজনটা বিশ্বাসগত, যা পরিবর্তনযোগ্য। মুসলিমদের মধ্যে আরো কিছু বিভাজন দেখা যায় যার কোন ধর্মীয় ভিত্তি নেই। যেমন সুন্নিদের মধ্যে কড়া সুন্নি, ওয়াহাবী, মওদূদী, লা মাযহাবী ইত্যাদি। আর কিছু গবেষণা বা ইজতেহাদী পার্থক্য আছে। যেমন হানাফী, মালেকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী ইত্যাদি, যা শুধুমাত্র আনুষঙ্গিক পদ্ধতিগত বিষয় মাত্র। আর কিছু সমাজকল্যাণমূলক মতাদর্শগত পার্থক্য আছে। যেমন বর্তমানে ডান বা ইসলাম পন্থী, বাম বা সমাজতন্ত্রপন্থী ইত্যাদি। বাংলাদেশে বর্তমানে অনেকটাই ডানরা বিএনপির ছায়াতলে এবং বামরা আওয়ামী লীগের ছায়াতলে থাকলেও দু’পক্ষই ক্ষমতার বাইরে। যদিও বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নিজেদেরকে মধ্যপন্থী বলে দাবী করে।
ডানপন্থী ও বামপন্থীদের মধ্যে কিছু মিল এবং কিছু গরমিল আছে। যেমন ডানেরা সমাধান খুজেন ঐশীগ্রন্থে ও নবী-রাসূলের জীবনাদর্শে। আর বামেরা সমাধান খুজেন সমাজতন্ত্রে ও কার্লমার্কসের রচনা-দর্শনে। ডানেরা খেলাফত কেন্দ্রীক মুসলিম বিশ্বের ঐক্য কামনা করেন, আর বামেরা সীমান্ত ও ভিসামুক্ত বিশ্ব কামনা করেন। তবে উভয় পক্ষই আমেরিকা বিরোধী। “সকল খনীজ সম্পদের এক পঞ্চমাংশ শুধুমাত্র গরীবের প্রাপ্য” এবং “ধনীর ধনে গরীবের অধিকার আছে” ধর্মের এ নীতি উভয় পক্ষের চাওয়া হলেও তা বাস্তবায়নে কর্মসূচী ভিত্তিক ঐক্য নেই। যদিও এ ঐক্যই হতে পারে দেশের একমাত্র তৃতীয় বা বিকল্প শক্তি। এ ঐক্যের প্রতীক ছিলেন মাওলানা ভাসানী। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত বামদলগুলো হচ্ছেঃ
বাংলাদশেরে সাম্যবাদী দল (এম.এল) (চাকা), বাংলাদশেরে কমউিনষ্টি র্পাটি (কাস্তে), বাংলাদশেরে ওর্য়ার্কাস র্পাটি (হাতুড়ী), জাতীয় সমাজতান্ত্রকি দল-জাসদ (মশাল), জাতীয় সমাজতান্ত্রকি দল-জএেসডি (তারা), বাংলাদশে সমাজতান্ত্রকি দল (মই), বাংলাদশেরে বপ্লিবী ওর্য়ার্কাস র্পাটি (কোদাল), বাংলাদশে ন্যাশনাল আওয়ামী র্পাটি (কুঁড়ে ঘর), গণফোরাম (উদীয়মান সুর্য্য), গণফ্রন্ট (মাছ), বাংলাদশে ন্যাশনাল আওয়ামী র্পাট-িবাংলাদশে ন্যাপ (গাভী), ঐক্যবদ্ধ নাগরকি আন্দোলন (চাবি), বাংলাদশে আওয়ামী লীগ (নৌকা)।
লেখকঃ আহবায়ক, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান মুসলিম ঐক্য পরিষদ। ০১৮১৯ ৮৩৩২৩৫। ই-মেইলঃ saifuleidgahcox@yahoo.com
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন