|
সোয়েব সাঈদ:
সমাজ ও রাষ্ট্রে যা কিছু অনিয়ম ও অনাচার সংঘটিত হয় তা সংবাদপত্রের মাধ্যমে পাঠক জানতে পারেন। অসুন্দর ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে সংবাদকর্মীগণ বরাবরই লিখে থাকেন। কিন্তু মন্দের বিরুদ্ধে যেমন লেখা উচিত তেমন যা সব ভাল তাও সমাজের দৃষ্টিপটে আনা সমুচিত। এতে মানুষের ইতিবাচক আচরণ উৎসাহ লাভ করে। এরূপ উৎসাহ ও উদ্দিপনা পাওয়ার মত অন্তর উচ্চতার উদাহরণ সৃষ্টির একটি কাজ হয়েছে রামু উপজেলার রাজারকুল ইউনিয়নের ঐতিহাসিক রামকোট-এর দক্ষিণ পার্শ্বস্থ কাটলিয়া পাড়ায়। এ গ্রামের জনৈক ছব্বির আহমদের মেয়ে কামরুন্নাহার এর বিবাহ হয়েছে সম্পূর্ণ যৌতুকবিহীন ইসলামী সংস্কৃতির নীতিতে। একজন নারীকে বিরল সম্মান দিয়ে জীবন সঙ্গীনী করে অন্তর উচ্চতার উদাহরণ সৃষ্টিকারী বর-এর নাম মোঃ জসিম উদ্দিন। তিনি, রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের পূর্ব মেরংলোয়া এলাকার মোঃ শফিকুল ইসলামের ছেলে। গত শুক্রবার (২২ জুলাই) এ বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়।
কণে কামরুন্নাহারের বড় ভাই মৌলানা মোঃ আলমগীর এ প্রতিবেদককে জানান, বর পক্ষ তাদেরকে একটি পয়সাও খরচ করতে দেননি। তার বোনের জন্য ইতিপূর্বে কয়েকটি প্রস্তাব এসেছিল। কিন্তু প্রতিটি প্রস্তাবে যৌতুকের দাবী থাকায় বিয়ে হয়নি। সমাজের নীরব ঘাতক যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্য বর পক্ষকে আহবান জানিয়ে কণে পক্ষের সম্পূর্ণ বিনাখরচ ও যৌতুকবিহীন এ বিয়ে আয়োজনে মূল ভূমিকা রেখেছেন, কক্সবাজার পি.টি.আই এর প্রাক্তন সুপার ও পি.ই.ডি পি-২ এর কনসালটেন্ট মোঃ নাসির উদ্দিন। পিছিয়ে পড়াদের বন্ধুখ্যাত এই শিক্ষাবিদ এর সাথে এ প্রসংগে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যৌতুক সমাজদেহের একটি ছত্রাক। এর নিরাময়ের জন্য কেবল সভা-সেমিনার নয়, কাজ দরকার। পরামর্শের চেয়ে কাজের দৃষ্টান্ত কার্যকর বেশী। আমি কর্মী মানুষ, তাই কাজটি করলাম।
বিবাহস্থলে উপস্থিত নারী নেত্রী কুলসুম আবুল বলেন, এ বিবাহে নারীর অধিকার ও মর্যাদা মহিমান্বিত হয়েছে। বিয়েতে আসা স্থানীয় সমাজসেবক মোঃ কামাল উদ্দিন জানান, এ বিয়েতে বর পক্ষের সংযমী, নির্লোভ ও যৌতুকবিরোধী বাস্তবমুখি প্রশংষনীয় অবস্থান ফুটে উঠেছে। এর ফলে কণের দরিদ্র পরিবার যৌতুকের জ্বালা থেকে যেমন রেহাই পেয়েছে। এছাড়া বর পক্ষ আগে থেকেই কণে পক্ষকে জানিয়ে রেখেছিলো, বিয়েতে যেন কোন খাবারের আয়োজন না হয়। এতে আপ্যায়নের চাপ থেকেও রক্ষা পায় কণের পরিবার। স্থানীয় ইউপি সদস্য মোঃ ইদ্রিচ জানান, এমন বিয়ে হওয়ায় ওই এলাকায় যৌতুক দাবীতে জর্জরিত অনেক পিতা-মাতার কন্যাদায় থেকে মুক্তি পাওয়ার দুয়ার খুলে দিয়েছে। সমাজসেবিকা মনোয়ারা বেগম (লুলু) বলেন, অত্যন্ত সহজ সরল সংস্কৃতির এরূপ শুভ বিবাহ দেখে খুশি হয়েছি। আমার বিশ্বাস, বিবাহ যদি এমন হয় পরিবারে কন্যাসন্তান নিয়ে এখন থেকে পিতা মাতার দুর্ভাবনার পরিসমাপ্তি ঘটবে। বিবাহে উপস্থিত প্রবীন ব্যক্তি শামসুল আলমের উচ্ছ্বসিত উক্তি, কন্যাপক্ষের ব্যয়বিহীন এমন বিবাহ ব্যবস্থা সব বর পক্ষ অনুসরণ করলে সমাজ উপকৃত হবে। বিয়ে পড়াতে আসা স্থানীয় কাজী অফিসের সহকারী কাজী রুহুল আমিন বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, জীবনে অনেক বিয়ে দেখলাম। কিন্তু এমন যৌতুক বিহীন বিয়ে এই প্রথম বারের মতো দেখলাম। এবিয়েতে কণে পক্ষের কোন খরচ হয়নি। কোন অতিথিকে আপ্যায়নও করতে দেখিনি। এটা কন্যাপক্ষের একেবারে খরচশূন্য বিবাহ। যা সমাজে বিরল।
ওই বিয়ে স্থলে আসা কয়েকজন ব্যক্তি সমাজ পরিস্থিতি বিশ্লে¬ষণ করে অভিমত দেন, যৌতুক প্রথার পিষনে পরিবারে কন্যা সন্তানের জন্ম আনন্দ উৎসব সৃষ্টি করেনা। একটি কন্যা পরিবারের জন্য যেন আপদ দায়। কন্যা শিশুটি জন্ম থেকেই অন্যদের অনীহা ও অবহেলার শিকার হয়ে বেড়ে উঠে। শেষমেষ বিবাহের বয়সে পিতা-মাতার কাছে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। সমাজে কথিত যৌতুক প্রথার এমন মহোৎসব বিরাজকালে রামুর প্রান্তিক এ জনপদে সম্পন্ন হওয়া এ বিয়ে বোঝার বিপত্তি থেকে কন্যা সন্তানদের মুক্তি দিতে জনসমাজকে অনুপ্রাণিত করতে পারে। সমাজে নারীর মূল্যবোধ, অধিকার ও মর্যাদায় ভাটির যে টান পড়েছে তাতে জোয়ার আনতে পারে।
সম্পূর্ণ যৌতুক বিহীন, অনুকরণীয় ও বিরল এ বিয়ের কথা শুনে সেদিন বিয়ে অনুষ্ঠান চলাকালে কণে পক্ষের বাড়িতে গিয়েছিলেন এ প্রতিবেদক। অনুষ্ঠানে উপস্থিত প্রবীন ব্যক্তিবর্গের অনুরোধে যৌতুকবর্জিত বিবাহের বর-কণের গলায় ফুলের মালা পড়িয়ে দিয়ে অভিনন্দিত করেন, সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক, দৈনিক আমার দেশ এর রামু প্রতিনিধি ও দৈনিক কক্সবাজার-এর স্টাফ রিপোর্টার সোয়েব সাঈদ।
এ বিয়ের বর মোঃ জসিম উদ্দিন জানান, কক্সবাজার পি.টি.আই এর প্রাক্তন সুপার মোঃ নাসির উদ্দিন আমাকে যৌতুকের খারাপ দিক সম্পর্কে অবহিত করলে আমি তাঁর কথায় উৎসাহিত হয়ে যৌতুকবিহীন বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই। আমার পিতা একজন সরকারী কর্মচারী। তিনিও সানন্দে এ সিদ্ধান্ত মেনে নেন। আর এধরনের বিয়ে হওয়ায় আমি এখন নিজেকে ধন্য মনে করছি। এলাকাবাসী জানান, যৌতুক প্রথা বন্ধে নাসির স্যারের মতো সবাই যেন বাস্তবমুখি ভূমিকা রাখেন। ভিন্নধর্মী এ বিয়েকে ঘিরে কণের প্রতিবেশীদের উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে।
ছবির ক্যাপশন- রামুতে যৌতুকবিহীন বিয়েতে বর-কণের গলায় ফুলের মালা পড়িয়ে দিয়ে অভিনন্দিত করছেন, রামু প্রেস ক্লাবের অর্থ সম্পাদক সোয়েব সাঈদ।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন