|
বিত্তবৈভবের সঙ্গে চৌর্যবৃত্তির সম্পর্ক রয়েছে কথাটি ইউরোপের দার্শনিক প্রুধো অনেক আগেই বলেছেন। বিশ্বকবি রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতায় সামন্ত যুগের দখলবাজদের প্রসঙ্গে তীব্র কটাক্ষ করেছেন। 'যার বেশি আছে সে আরও বেশী চায় কাঙ্গালের ধন চুরি করে রাজায়'। সেটিও জমি দখলের বেলায়। বর্তমানে সময়ের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় যদি অসহায়দের জমি দখল নিয়ে শক্তির মহড়া চলে তাহলে সরকারের অগ্রগতি প্রশ্নবিদ্ধ হবে। সভ্যতা সংস্কৃতি শব্দগুলো জাতিকে উপহাস করবে। ইতিমধ্যে
তা শুরু হয়ে গেছে উখিয়ার সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায়। সোনারপাড়া, নিদানিয়া, ইনানী, মোহাম্মদ শফির বিল, বাইলা খালী, বোয়াং খালী, চেইনচুরি, রূপপতি, ইমামের ডেইল, চোয়ানখালী, চেপট খালী, মাদার বনিয়া ও মনখালী সহ আশ পাশের এলাকা গুলোতে প্রভাবশালী ক্ষমতাশালী কর্তৃক অসহায়দের জমি দখলের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। ক্ষমতার অপব্যবহার ও অস্ত্রের মহড়া, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে অসহায় মানুষদের জমি কেড়ে নেয়া হচ্ছে। দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের পাশে দাড়াঁনোর কোন সজ্জন নেই, থাকলেও তারা অপশক্তির বিরুদ্ধে যেতে পারে না। গেলে মিথ্যা মামলার আসামী ও খুন হতে হয় কিংবা পলাতক জীবন যাপন করতে হয়। যার কারণে এতদঞ্চলের ২০ হাজার মানুষ জমি হারানোর ভয়ে উদ্বেগ উৎকন্ঠার মধ্যে বসবাস করছে।
জানা যায়, তিনশত বছর পূর্বে সমুদ্র উপকুলীয় এলাকায় প্রথম জন বসতী গড়ে উঠে। তৎসময়ে কানা রাজা নামে জনৈক ব্যক্তি পাটুয়ার টেক নামক স্থানে আস্তানা করে বসবাস করতে থাকে। পরে চাকমা সমপ্রদায়ের লোকেরা চেনছরি, মাদার বনিয়া, ও মনখালীতে বসতী স্থাপন করে। পর্যায়ক্রমে মুসলিম সহ বিভিন্ন সমপ্রদায়ের দরিদ্র, হত দরিদ্র ও ভূমিহীন মানুষ ধীরে ধীরে সমুদ্র উপকুলীয় এলাকায় বসবাস করে আসছে। বর্তমানে সমুদ্র উপকুলীয় এলাকায় প্রায় অর্ধলাখ মানুষ বসবাস করছে। যার ৬০ শতাংশেরও বেশী দরিদ্র ও হত দরিদ্র। বনাঞ্চলে লাকুড়ী কুড়ানো, সাগরে মাছ ধরা ও বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ করে তারা জীবন জীবিকা নির্বাহ করে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ৯০ দশকের পুর্বে সমুদ্র উপকুলীয় এলাকার এক একর জমি বিক্রি হত মাত্র লাখ টাকায়। ৯০ দশকের পরে সরকার সমুদ্র উপকুলীয় এলাকাকে পর্যটন জোনের আওতায় আনার উদ্যোগ নিলে ধীরে ধীরে ওই এলাকার জমির মুল্য বাড়তে থাকে। বর্তমানে সমুদ্র উপকুলীয় এলাকার এক একর জমি বিক্রি হচ্ছে ৩ থেকে ৪ কোটি টাকা দামে। এসব জমি ক্রয় করছে দেশের শীর্ষ স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতা, ব্যবসায়ী ও সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কর্মরত চাকুরীজীবি। জমির মূল্য অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে যাওয়ায় ওই সব জমির উপর শকুন দৃষ্টি পড়েছে ভূমি দসু্য ও সন্ত্রাসী প্রকৃতির লোকের। তারা কৌশলে ভুয়া খতিয়ান সৃজন, জাল দলিল তৈরী ও দাপট দেখিয়ে নিরীহ অসহায় মানুষের জমিগুলো কেড়ে নিচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাদের উপর চলে দমন, নিপীড়ন, নির্যাতন। চাপিয়ে দেয়া হয় মিথ্যা মামলা। গত ৩ বছরে সোনার পাড়া,নিদানিয়া, ইনানী, মোহাম্মদ শফির বিল, চেইনছরি, বাইলাখালী, ইমামের ডেইল, চোয়ংখালী, বোয়ংখালী,চেপটখালী, মনখালী সহ বিভিন্ন গ্রামের কয়েক শত বসতী জোর পুর্বক উচ্ছেদ করা হয়েছে। আরও কয়েক হাজার পরিবারের বসতঘর থাকলেও তাদের জমিটুকু কাগজে কলমে বিক্রি হয়ে গেছে অনেক আগে। আগামী কয়েক বছর পর তাদেরকে দমন নির্যাতন চালিয়ে উচ্ছেদ করা হবে। গত ২৩ মে সোনার পাড়াস্থ বড় পাড়া গ্রামের মৃত রশিদ আহম্মদের কন্যা কুলসুমা বেগমের বসত ঘরটি ভেঙ্গে ঘরের সমস্থ মালামাল নিয়ে যায় একই গ্রামের সোলতান আহম্মদের ছেলে মোহাম্মদ আলী (৪৫) সহ একদল ভুমি দসু্য ও ভাড়াটিয়া বাহিনী। কুলসুমা জানান, এলাকায় জায়গা জমির মুল্য বেড়ে যাওয়ায় সন্ত্রাসীরা দীর্ঘ দিন ধরে তার বসত ভিটা কেড়ে নেওয়ার পায়তারা করে আসছে। ভুমি দসু্যরা জমি কেড়ে নিতে ব্যর্থ হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ১৪টি মিথ্যা মামলা দায়ের করেছে। স্থানীয় মহিলা মেম্বার ফরিদা আক্তার জানান, গত ২১ ফেব্রুয়ারী উখিয়া থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকতর্া রফিকুল ইসলাম কুলসুমার জমিতে কোন ধরনের হস্তক্ষেপ না করার নিষেধ করেছিল। কুলসুমার ছেলে রহমত উল্লাহ জানান, সন্ত্রাসীরা বসত ঘরের চিহ্নি পর্যন্ত রাখেনি। সন্ত্রাসীরা তাদের ঘরটি ভেঙ্গে দেওয়ায় ৩ ভাই, ১ বোন ও মাকে নিয়ে অন্যের বাড়ীতে রাত কাটাচ্ছেন। ভুমি দসু্যরা প্রতিনিয়ত দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার হুমকি দিচ্ছে। কুলসুমার পরিবারের মত সমুদ্র উপকুলীয় এলাকার হাজারো মানুষের একই অভিযোগ। স্থানীয়দের মধ্যে ব্যবসায়ী আব্দুস ছামাদ, শামশুল আলম জানিয়েছেন, এভাবে প্রভাবশালীরা নিরহ লোকজনকে নির্যাতন করে আসছে। প্রশাসনিক ভাবে এ ধরনের কোন ঘটনার বিচার হয়না। কালো টাকার কাছে অসহায় মানুষের বিচারের বানী নিরবে নিভৃতে কাঁদছে। যার কারণে সমুদ্র উপকুলীয় এলাকার ২০ হাজার মানুষ বসতবাড়ী হারানোর ভয়ে আতংকের মধ্যে রয়েছে। এ ব্যাপারে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন বলে সচেতন মহল মনে করেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন