
ইউএনটি ডেস্ক
বিরোধীদলীয় নেতা ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো ও ইসমাইল হোসেন সায়মনকে অর্থপাচার মামলায় ৬ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। একই সাথে সিঙ্গাপুরের ব্যাংকে জমা করা অর্থ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জব্দ করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এছাড়া উভয়কে ৩৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
ঢাকার ৩ নম্বর বিশেষ জজ আদালত-এর
বিচারক মোজাম্মেল হোসেন আজ বৃহস্পতিবার বেলা ১২টা ১৫ মিনিটে জনাকীর্ণ আদালতে এ রায় ঘোষণা করেন। আসামিদ্বয় পলাতক থাকায় আত্মসমর্পণ বা তাদের আটকের তারিখ থেকে সাজা কার্যকর হবে বলে আদালতের রায়ে বলা হয়েছে।
এর আগে আদালত ১১টা ২৪ মিনিটে এজলাসে আসন গ্রহণ করেন। বিচারিক কাজ শুরুর আগে আদালত বেলা সাড়ে ১২টায় এ মামলায় রায় ঘোষণার জন্য সময় নির্ধারণ করেন।
গত ১৯ জুন যুক্তিতর্ক গ্রহণ শেষে রায় ঘোষণার তারিখ আজ ধার্য করা হয়। ১৫ জুন সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করে আদালত। এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ২৩ সাক্ষীর মধ্যে ২১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে।
'পলাতক' দেখানোর কারণে আইনানুযায়ী আসামি পক্ষে কোনো আইনজীবী আদালতে ছিলেন না। ফলে রাষ্ট্রপক্ষে একতরফা শুনানি শেষেই আদালত রায় ঘোষণার জন্য দিন ধার্য করেন। এর আগে সাক্ষ্য গ্রহণের শেষ পর্যায়ে আদালত রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারাধীন এ মামলাটি ২০০৯-এর পরিবর্তে ২০০২ সালের আইনে নতুন করে অভিযোগ গঠন করেন। গত ৬ জুন রাষ্ট্রপক্ষ থেকে মামলার অভিযোগ পরিবর্তনের আবেদনটি করা হয়।
এ মামলায় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন আনিসুল হক। তাকে সহায়তা করেন মোশারফ হোসেন কাজল ও শেখ বাহারুল ইসলাম।
রায় উপলক্ষে সকাল থেকেই আদালতকে ঘিরে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ ও র্যাব মোতায়েন ছাড়াও সাদা পোশাকে বিভিন্ন সংস্থার সদস্যদের কড়া নজরদারি ছিল। এমনকি, রায় প্রদানকারী আদালতের এজলাসের পেছনের লবিতে নিরাপত্তা ব্যুহ ছিল নজিরবিহীন। আদালতে প্রবেশকারী সকলেরই দেহ তল্লাশি করা হয়।
রায় শুনতে আইনজীবী ও সাংবাদিকসহ বিপুল সংখ্যক মানুষ সকাল থেকেই আদালতে ভিড় করেছিল। এদিকে আদালতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাল্টাপাল্টি মিছিল বের করে। দলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে ঢাকা বারের সভাপতি শেখ হেমায়েত হোসেনের নেতৃত্বে আওয়ামী আইনজীবীরা শান্তি মিছিল বের করে। অন্যদিকে আদালত বসার পর থেকে ঢাকা বারের সাবেক সভাপতি সানাউল্যা মিয়া, মাসুদ আহমেদ তালকুদার, খোরশেদ আলম, তাহেরুল ইসলাম তৌহিদ, জয়নাল আবেদিন মেজবাহ প্রমুখের নেতৃত্বে বিএনপিপন্থি আইনজীবীরা মিছিল করতে থাকে। তারা সরকারের ফরমায়েশ অনুযায়ী বিচার কাজ পরিচালনার বিরুদ্ধে নানা শ্লোগান দেন। এক পর্যায়ে আদালত পুলিশ কর্মকর্তাদের ডেকে মিছিল বন্ধ করার নির্দেশ দেন। মিছিলকারীরা বেলা পৌনে ১২ টার দিকে বিচারিক আদালতের দিকে যেতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এ সময় মিছিলকারীদের সাথে পুলিশের ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পুলিশ লাঠিচার্জ করে মিছিলকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করলে সেখানে কিছু সময় ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন আইনজীবী আহত হন।
প্রসঙ্গত, সীমেন্স বাংলাদেশকে একটি কাজ পাইয়ে দেয়ার ঘুষের অর্থ লেনদেনের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০০৯ সালের ১৭ মার্চ বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো এবং সাবেক নৌ-পরিবহন মন্ত্রী প্রয়াত আকবর হোসেনের ছেলে ইসমাইল হোসেন ওরফে সায়মনের বিরুদ্ধে মামলাটি দায়ের করে। মামলায় সিঙ্গাপুরে ২৮ লাখ ৮৪ হাজার ৬০৩ সিঙ্গাপুর ডলার এবং নয় লাখ ৩২ হাজার ৬৭২ মার্কিন ডলার (সে সময়ের বাজারদর অনুযায়ী ২০ কোটি ৮৫ লাখ ৮৪ হাজার ৫১৮ টাকা) অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ করা হয়। একই বছরের ১২ নভেম্বর কোকো ও সায়মনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ ও দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনে অভিযোগপত্র দেয় দুদক। এ মামলায় কোকোর বিরুদ্ধে গত বছর ৩১ অক্টোবর গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। অন্যদিকে মামলা দায়েরের পর থেকেই সায়মন পলাতক রয়েছেন। গত ৩০ নভেম্বর কোকো এবং সায়মনের বিরুদ্ধে এ মামলায় অভিযোগ গঠন করা হয়।
উল্লেখ্য, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার সাথে কোকো গ্রেফতার হন। ২০০৮ সালের মে মাসে সরকারের নির্বাহি আদেশে সাময়িক মুক্তি (প্যারোল) পেয়ে কোকো বিদেশে চিকিৎসা করাতে যান। এরপর দফায় দফায় প্যারোলে মুক্তির মেয়াদ বাড়ানো হয়। গত বছর ১৯ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোকোর প্যারোল বাতিল করে তাকে দেশে ফিরতে চিঠি দেয়। এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে কোকোর পক্ষে রিট করা হলে ১১ অক্টোবর হাইকোর্ট সেটি নাকচ করে রায় দেন। পরে কোকো আত্মসমর্পণ না করায় আদালত তার অনুপস্থিতিতেই চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি বিচার কাজ শুরু করেন।
এদিকে রায় ঘোষণার আগেই বুধবার কোকোর আইনজীবীরা এক সংবাদ সম্মেলনে ন্যায়বিচার না পাবার আশংকা ব্যক্ত করেছিলেন। তারা অভিযোগ করে বলেছেন, কোকোকে শাস্তি দেয়ার বিষয়টি সরকার পূর্ব নির্ধারিত করে রেখেছে। এ কারণে ত্রুটিপূর্ণভাবেই তাড়াহুড়ো করে মামলা পরিচালনা করা হচ্ছে। বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে সরকার বিরোধী দলকে দমনের কৌশল বেছে নিয়েছে বলেও তারা মন্তব্য করেন।
এছাড়া নতুন আইনে পুরনো ঘটনায় মামলা করার বিষয়টিকে সুপ্রিম কোর্টের আদেশের পরিপন্থি উল্লেখ করে গত ২৭ এপ্রিল কোকোর পক্ষে তার আইনজীবীরা দুর্নীতি দমন কমিশনে আবেদন করেন। দুদক চেয়ারম্যান এ ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ নেয়ার আশ্বাস দিলেও তার কোন সাড়া মিলেনি।
কোকোর বিরুদ্ধে কর ফাঁকির আরেকটি মামলা মহানগর দায়রা জজ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
(শীর্ষ নিউজ ডটকম/
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন