|
তিয়াত্তর বছর বয়সের আওয়ামী লীগার টানা ৪৭ বছর পার করে দিয়েছেন মুজিব কোট গায়ে দিয়ে। কি গরম-কি ঠান্ডা মুজিব কোট তার গায়ে থাকেই। এমনকি ঈদ-কোরবানের পোশাকের সাথেও থাকে সেটি। সেই ১৯৬৪ সালে প্রথম একটি মুজিব কোট তিনি সেলাই করেছিলেন। তাও বঙ্গবন্ধুর কক্সবাজার আগমন উপলক্ষে। সেই মুজিব কোট নিয়ে যখন বঙ্গবন্ধুর সাথে মঞ্চে উঠলেন তখন বঙ্গবন্ধু নাকি মুচকি হেসে বলেছিলেন-সত্যিইতো তোকে বেশ মানিয়েছে, সব সময় পড়বি কিন্তু...। তার সেই মুজিব কোট আর ছাড়া হয়নি। তিনি আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম (৭৩)। কক্সবাজার জেলা শহরের বহুল প্রচারিত সংবাদপত্র দৈনিক কক্সবাজার এর সম্পাদক ও প্রকাশক হলেও তিনি আওয়ামী লীগার হিসাবেই সবচেয়ে বেশী পরিচিত। কেননা তিনি আওয়ামী লীগের ক্রান্তিকালেও এক মুহর্তের জন্যও মুজিব কোট খুলেননি। মুজিব কোটের সাথে আপোষও করেন নি কোন দিন। মুজিব কোট নিয়ে বিব্রত নয় রিতীমত গর্ব করেন তিনি। তিনি বলেন, মুজিব কোট নিয়ে আমি দেশের একজন রাষ্ট্রপতি এবং একজন প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করতে গিয়ে বার বার বাঁধার সন্মুখিন হয়েছিলাম। তবুও আমি মুজিব কোট খুলিনি। আওয়ামী লীগার আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতিও। মরহুম রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান কক্সবাজার সফরে এসে সার্কিট হাউজে প্রেস ক্লাব সভাপতিরও ডাক পড়েছিল। তিনি গেলেন যথারিতী। কিন্তু সেখানে যেন বিধি বাম। মোহাম্মদ নুরুল ইসলামের গায়ে মুজিব কোট দেখে রাষ্ট্রপতির সফর সঙ্গীরাও এক প্রকার হতবাক। তাদের অনেকেই এসময় বলাবলিও করছিলেন-লোকটার কেমন সাহস ? এমনকি রাষ্ট্রপতির দেহরক্ষীরা এগিয়ে এসে সার্কিট হাউজের ফটকেই মোহাম্মদ নুরুল ইসলামকে থামিয়ে দেন। তারা তাকে বললেন, গায়ের মুজিব কোট খুলে যেন রাষ্ট্রপতির সাথে বসেন। তাতেও তিনি রাজি হলেন না। অগত্যা মুজিব কোট গায়ে তাকে ঢুকার অনুমতি দেয়া হল। পুরো অনুষ্ঠানে ছিলেন কেবল তিনি একাই মুজিব কোট গায়ে। ফলে সবারই দৃষ্টি ছিল তার উপর। মুজিব কোট দেখে রাষ্ট্রপতিও বার কয়েক তাকালেন তার দিকে। এক সময় মোহাম্মদ নুরুল ইসলামকে রাষ্ট্রপতি জিয়া কাছে নিয়ে বললেন, আসুন আমার সাথে দল করি। জবাবে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বললেন, আমার গায়ে মুজিব কোট-আমি দল করি বঙ্গবন্ধু মুজিবের। প্রতিউত্তরে রাষ্ট্রপতি জিয়াও নাকি বলেছিলেন-আমরাওতো বঙ্গবন্ধুর... কিন্তু তিনিতো এখন নেই। মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বললেন অরেকবারের কথা। সেই সময় রাজধানী ঢাকায় গনভবনে ডাক পড়েছিল। তখন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। সেবার দৈনিক কক্সবাজার সম্পাদক হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার পালা ছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে তাদের গাড়িতে তুলে নেয়ার সময় আপত্তি ঊঠল মুজিব কোট নিয়ে। সংশ্লিষ্টরা তাকে অনুরোধ করলেন, গায়ের মুজিব কোটটি খুলে গাড়িতে রেখে দিতে। তিনি বলেছিলেন-তাহলে আপনারা আমাকে নামিয়ে দিন। শেষ পর্যন্ত তাকে মুজিব কোট নিয়েই সেই অনুষ্ঠানেও যাবার অনুমতি দেয়া হয়। ১৯৬৪ সালে আওয়ামী লীগের কক্সবাজার মহকুমা কমিটির সাংগটনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম। বর্তমানে তিনি কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের জেষ্ঠ সহ সভাপতি। প্রয়াত ফনিভষণ মজুমদার যখন কৃষক লীগের সাধারন সম্পাদক ছিলেন তখন মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম ছিলেন দলের পলিট ব্যুরোর সদস্য। তিনি জানান, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগষ্ট ট্য্রাজেডির সময়ও আমি ছিলাম রাজধানী ঢাকায়। এই বিয়োগান্তুক ঘটনার পর অনেকেই মুজিব কোট খুলে লুকিয়ে রেখেছিলেন। আমার সঙ্গীয় দলীয় নেতাদেরও কজন আমাকে মুজিব কোট খুলতে বলেছিলেন। এমনকি তারা আমার সাথে থেকে নিরাপদ মনে না করে অনেকেই আমাকে ছেড়েও দিয়েছিলেন। অথচ আমি সেই ক্রান্তিলগ্নেও গায়ের মুজিব কোট নিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজার এসে পৌঁছি। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু যে মুজিব কোট গায়ে দিতেন সেটি আমিও দিই। আশি দশকে মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলার মগনামা ইউনিয়ন পরিষদে উপর্যুপরি ২ বার চেয়ারম্যানও নির্বাচিত হন। আপাদ মস্তক একজন আওয়ামী লীগার আলহাজ্ব মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম বললেন, মৃত্যুর সময়ও যাতে এটি আমার গায়ে থাকে-এটাই আমার কাম্য।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন