কালাম আজাদ,কক্সবাজার:
উখিয়ায় প্রায় আড়াই লক্ষাধিক জনগণের স্বাস্থ্য সেবা পাওয়ার একমাত্র নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্টান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ নৈরাজ্যকর পরিবেশ বিরাজ করছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও চারটি ইউনিয়ন সাব-সেন্টার মিলে ১৩ জন ডাক্তারের মধ্যে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র একজন ডাক্তার দিয়ে বিপুল সংখ্যক লোকের সাথে স্বাস্থ্য সেবার নামে সরকার প্রতারণা করছে বলে রোগী ও স্থানীয় লোকজন অভিযোগ করেছেন। উখিয়ায় কর্মরত পাঁচ ডাক্তারের মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিধিবহির্ভূত আদেশে ইতোমধ্যে ৩ জন বদলী হয়ে অন্যত্র চলে গেছেন। ৯ জন সেবিকার মধ্যে ২ জন কর্মরত থাকলেও তারাও অন্যত্র বদলী হয়ে যেতে তদ্বীর করছেন বলে জানা গেছে। এসব ঘটনার অন্তরালে হাসপাতালের ৩য়/৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী ও স্থানীয় বখাটে সিন্ডিকেটের
অন্যায় আবদার ডাক্তাররা মিটাতে অনিহা প্রকাশ করেন বলে নিরাপত্তার অভাবে তারা বদলী হতে বাধ্য হন এ অভিযোগ একাধিক মহলের।
অন্যায় আবদার ডাক্তাররা মিটাতে অনিহা প্রকাশ করেন বলে নিরাপত্তার অভাবে তারা বদলী হতে বাধ্য হন এ অভিযোগ একাধিক মহলের।
উখিয়া সদরের গ্রাম্য ডাক্তার শহীদ বলেন, স্বাস্থ্য সেবার নামে জনগণের সাথে সরকারের এ কোন ধরনের প্রতারণা। গত ২৭ জুলাই রাত ১১টার দিকে আমাশয় আক্রান্ত এক রোগীকে নিয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসার জন্য গেলে কোন ডাক্তার বা নার্স পাওয়া যায়নি। দায়িত্বরত একজন নৈশ প্রহরীর পরামর্শে মধ্যরাতে ঐ রোগীকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নিয়ে যেতে বাধ্য হই। তার ক্ষোভ, যেখানে পেট ব্যাথা, আমাশয় রোগীর সামান্য চিকিৎসা জুটে না সেখানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর অর্থ কী হতে পারে। কিছুদিন আগেই হাসপাতালের জরুরী বিভাগে গিয়ে দেখা গেছে, জরুরী বিভাগে বসে একমাত্র ডাক্তার উত্তম বড়য়া রোগী দেখছেন যেন তার নিঃশ্বাস ফেলার সুযোগ নেই। দোতলায় পুরুষ ওয়ার্ডে ব্যাথার রোগী মং রা অং (৩৪), মহিলা ওয়ার্ডে ভাইরাস জ্বরে আক্রান্ত ৪ বছরের শিশু ইয়াসমিনের মা জুহুরা বেগম (২৫), নিউমোনিয়া আক্রান্ত ৪ বছরের শিশু নুরুল আবছার সহ অনেক রোগী অভিযোগ করে বলেন, ২৪ ঘণ্টায় একবার ডাক্তার-নার্সের দেখা মিলে,দোতলা উঠার সিঁড়িতে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ কুকুর ঘুমাতে দেখা যায়। হাসপাতালে ওয়ার্ড ফ্যান থাকলেও রেগুলেটর নেই, ফ্যানের অনেকটি ঘুরে না, বাল্ব থাকলেও জ্বলে না। বাথরুম ও টয়লেটে দুর্গন্ধে ঢুকা দায়। এভাবে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
৩১ শয্যার উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করনের কাজ চললেও জনগণের স্বাস্থ্য সেবার মানোন্নয়নে কারো নজর নেই। স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকার এক বছর পূর্বে এডহক ভিত্তিক জরুরী ভাবে সারা দেশে ডাক্তার নিয়োগ প্রদান করেন। সরকারী ঘোষণা অনুযায়ী এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্ত ডাক্তারদের চাকুরী উপজেলা পর্য্যায়ে নূন্যতম দুই বছর বাধ্যতামূলক। কিন্তু সরকারী ঘোষণা ও জনগণের স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকে এক প্রকার বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে এডহক ডাক্তাররা তদ্বীর করে এক বছরের পূর্বেই সুবিধা জনক পছন্দনীয় স্থানে বদলী হয়ে যেতে শুরু করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় এডহক ভিত্তিতে নিয়োগ প্রাপ্ত চার জন ডাক্তারের মধ্যে ডাক্তার মোস্তফা নুর মোর্শেদ চট্টগ্রামের ফটিক ছড়ি, ডাক্তার খালেদ ইবনে আনোয়ার পটিয়ায় এবং হলদিয়াপালং সাব সেন্টারের ডাক্তার আরফাতুর রহমান উখিয়া থেকে ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বদলী আদেশ পত্র নিয়ে স্ট্যান্ড রিলিজ হয়ে পছন্দনীয় স্থানে চলে গেছেন। বাকী একজন স্থানীয় হওয়ায় তিনি এখনো রয়েছেন। উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৯ জন নার্সের পদ মঞ্জুরী থাকলেও ৪ জন মাত্র কর্মরত। তৎমধ্যে ১জন দীর্ঘ প্রায় ৬ মাস ধরে কর্তৃপক্ষের বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত রয়েছেন, অপর জন ২১ জুলাই অন্যত্র বদলী হয়ে গেছেন। বাকী যে ২ জন রয়েছেন তারাও চলে যেতে তদ্বীর করছেন বলে জানা গেছে। বর্তমানে উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ৪টি ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ১৩ জন ডাক্তারের স্থলে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মাত্র ১ জন ডাক্তার উখিয়ার প্রায় আড়াই লক্ষাধিক লোকের হাস্যকর স্বাস্থ্য সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। কার্যত উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ইউনিয়ন উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র গুলো নানা জঠিল রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজেই গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় মুলত জনগণের স্বাস্থ্য সেবা কার্য্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।
উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডাক্তারদের সবকটি চেম্বার খালি। একটিতে ইপিআই টেকনেশিয়ান হামিদ আলী, আরেকটিতে ডেন্টাল টেকনেশিয়ান রাজীব নাথ দুরদুরান্ত থেকে আসা গরীব রোগী দেখছেন। রাজীব নাথের পাশের চেয়ারে নিষিদ্ধ থাকার পরও বসে আছেন একটি ঔষুধ কোম্পানীর (রেনেটার ফাহিম) এমআর। সাংবাদিক জানতে পেরে দ্রুত চলে যান। একজন দাঁতের টেকনেশিয়ান হয়ে কীভাবে আগত রোগীদের নানা রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে প্রসঙ্গে রাজীব নাথ বলেন, কী করব, প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, ডাক্তারের অভাবে তাকে এ কাজ করতে হচ্ছে। ইপিআই টেকনেশিয়ানও তাই জানালেন। একমাত্র ডাঃ উত্তম বড়য়া জানান, এ ধরনের নৈরাজ্যকর পরিবেশ দেশে কোন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ আছে কীনা তার জানা নেই। তিনি বলেন, উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স নিজে নানা জঠিল রোগের আক্রান্ত। কোন সুইপার নেই, এমএলএসএস, ওয়ার্ডবয়, স্বাস্থ্য সহকারী পদেও লোকবলের সংকট। একজন এমএলএসএস দিয়ে হাসপাতালের অ্যাম্বুলেন্স চালানো হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য ও পঃ পঃ কর্মকর্তা ডাক্তার মহি উদ্দিন নিজে অসুস্থ হয়ে ছুটিতে আছেন। ফোনে তিনি উখিয়া হাসপাতালে উখিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নৈরাজ্যকর অবস্থার কথা স্বীকার করে বলেন, সুস্থ হয়ে ফিরে এ বিষয় নিয়ে গুরুত্ব সহকারে স্থানীয় সংসদ সদস্য ও কক্সবাজার সিভিল সার্জনের সাথে আলোচনা করে কার্য্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন