
ইউএটি ডেস্ক
মঙ্গলবার দুপুরে মিরসরাইয়ের আবু তোরাব এলাকায় প্রফেসর বাড়িতে নিহত কলেজ ছাত্র ইফতেখার উদ্দিন মাহমুদের কবরের সামনে দাঁড়িয়ে এভাবেই বিলাপ করছিলেন তার সহপাঠীরা।
প্রফেসর বাড়ির সদরুল আমিনের ছেলে ইফতেখার আবু তোরাব এলাকার প্রফেসর কামাল উদ্দিন কলেজের দ্বাদশ শ্রেণীর ছাত্র। দুর্ঘটনায় তার চাচাত ভাই, আবু তোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তাকিউল্লাহ মাহমুদও নিহত হয়েছে।
প্রফেসর বাড়ির পুকুর পাড়ে পাশাপাশি দু’ভাইয়ের কবর দেওয়া হয়েছে। তাদের পরিবারকে সমবেদনা জানাতে মঙ্গলবার দুপুরে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ও শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া প্রফেসর বাড়িতে যান।
একই সময় তাদের বাড়িতে যান নিহতদের সহপাঠী এবং শিক্ষকরাও। তাদের বাড়িতে গিয়ে সমবেদনা জানান জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিন।
সহপাঠী ও শিক্ষকরা প্রফেসর বাড়িতে গিয়েই ছুটে যান পুকুর পাড়ে কবর দু’টির সামনে। জিয়ারতের পর কবর দুটি ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন শিক্ষক ও ছাত্ররা।
এসময় প্রফেসর কামাল উদ্দিন কলেজের ছাত্র, ইফতেখারের সহপাঠী মো. আরিফ আকাশের দিকে দু’হাত তুলে ফরিয়াদ করেন, ‘আল্লাহ, আমরা কোনোদিন তারে অন্যায়, জুলুম করতে দেখি নাই। তুমি তারে ক্ষমা করে দাও। আল্লাহ তুমি আমাদের এ জমিন থেকে তুলে নাও আল্লাহ। আমরা আর সহ্য করতে পারছি না।’
আরিফের মর্মভেদী এ ফরিয়াদে কবরের সামনে থাকা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের মধ্যে কান্নার রোল উঠে। পরে সহপাঠীরা কবর ছুঁয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল ধ্রুব নাথ
আবু তোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র ধ্রুব নাথ। আবু তোরাব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০০৮ সালে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেয়েছিল ধ্রুব। প্রস্তুতি নিচ্ছিল অষ্টম শ্রেণী থেকে জেএসসি পরীক্ষায় ভাল ফলাফলের জন্য।
ধ্রুবর সহপাঠী বন্ধু বেলায়েত হোসেন বাংলানিউজকে বলেন, জীবনের কোনো পরীক্ষায় দ্বিতীয় হননি ধ্রুব। অষ্টম শ্রেণীতেও সে ছিল ফার্স্ট বয়। ক্লাসের দুর্বল ছাত্রদের সে সবসময় সহযোগিতা করত।
ধ্রুবর ক্লাস টিচার, আবু তোরাব বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মো. ইউনূসকে তার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি হাউমাউ করে কেঁদে উঠেন। কোনো প্রশ্নেরই তিনি জবাব দিতে পারেননি।
মেধাবী ছাত্র ধ্রুব সীতাকুণ্ডের জালালাবাদ এলাকার এস কে এম জুট মিলের কর্মকর্তা বীরেন্দ্রনাথ এবং স্থানীয় কিন্ডারগার্টেন স্কুলের শিক্ষিকা সুপ্রীতিনাথের ছেলে।
ফুটবলের মায়া কাল হলো ফনির আবু তোরাব এলাকার রফিকুল ইসলামের ছেলে আশরাফউদ্দিন ফনি (১৬) পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ে পড়ালেখা ছেড়ে দেয়। আড়াই বছর ধরে বিছানায় শয্যাশায়ী বাবার ওষুধের খরচ আর দু’ভাই-এক বোনের পড়ালেখা, ভরণপোষণের খরচ যোগাতে সে ও তার মা মানুষের বাড়িতে কাজ করত। আশৈশব ফুটবলের প্রেমে মত্ত ফনি সোমবার স্কুল ছাত্রদের সঙ্গে যান মিরসরাই স্টেডিয়ামে। আর ফিরতে পারেনি। ফুটবলের প্রেম তাকে নিয়ে গেছে পরপারে।
মঙ্গলবার দুপুরে তাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, ফনির মা রশ্মি বেগম বিলাপ করে কাঁদছে। চোখে জল নিয়ে তার ভবিষ্যতের জন্য একরাশ হতাশা আর উদ্বেগ। পরিবারের উপার্জনক্ষম বড় ছেলেকে হারিয়ে কিভাবে চলবে সংসার ? কে দেবে স্বামীর পথ্যের খরচ।
এদিকে মিরসরাই সংবাদদাতা রিগান উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, সোমবারের দুর্ঘটনায় বেঁচে যাওয়া ছেলেদের মধ্যে আলি নেওয়াজ উদ্দিন নোমান নিজ চোখে তার সঙ্গীদের মরতে দেখেছে। মঙ্গলবার সকালে কান্না জড়িত কন্ঠে নোমান বলে, ‘বেঁচে আছি, এটা বিশ্বাস করতে আমার কষ্ট হচ্ছে। পিকআপটি কাত হয়ে যাচ্ছে দেখে আমি ডোবায় লাফিয়ে পড়ি। চোখ ফেরাতেই দেখি পিকআপের মধ্যে থাকা কয়েকজন হাত-পা নাড়িয়ে বাঁচার জন্য প্রাণপণে শেষ চেষ্টা করছিল। কিন্তু তখন আমার কিছুই করার ছিল না। পরবর্তীতে এলাকার লোকজন এলে নিজ হাতে লাশ উদ্ধার করি। পরের ঘটনা আমার কাছে অষ্পষ্ট।’
মোল্লা পাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণীর ছাত্র জাবেদ বলেন, গাড়ি যখন ডোবার দিকে কাত হয়ে হেলে পড়ছিল, তখন আমি লাফ দিই। পিকআপটি পানিতে পড়লে ঢেউয়ের সাথে আমি ঢোবার কিনারায় পৌঁছে যাই। পরবর্তিতে কয়েকজন নারী গিয়ে আমাকে ডোবা থেকে উদ্ধার করেন।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন