
নগ্ন ভিডিওর ছোবলে হারিয়ে গেল বিএম কলেজের অনার্স তৃতীয় বর্ষের মেধাবী ছাত্রী সুপর্ণা বালা। গতকাল পরীক্ষা শেষে থানায় সহপাঠী প্রতারক বন্ধুর বিরুদ্ধে অভিযোগ দেয়ার কথা ছিল তার। কিন্তু নগ্ন ভিডিওর সংবাদ স্বামী জেনে যাওয়ায় লজ্জায় ও ক্ষোভে ঘরের সিলিং ফ্যানের সঙ্গে সে ওড়না পেঁচিয়ে আত্মহত্যা করে। পুলিশ সুপর্ণার সহপাঠী নজরুল ইসলাম নয়নকে আটক করেছে। সে তার দোষ স্বীকার
করেছে। নজরুল পুলিশকে জানিয়েছে, সে বিএম কলেজের ছাত্রলীগ নেতা কর্মপরিষদের ভিপি মইন তুষারের বন্ধু।
সূত্রমতে, সুপর্ণার বাড়ি সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলার পুইজালা গ্রামে । তার পিতার নাম সুবল বাসার। মেধাবী এ মেয়েটি বিএম কলেজে অনার্স (গণিত) বিভাগের ছাত্রী। পড়াশোনা অবস্থায় তার সঙ্গে প্রেম হয় একই এলাকার (সাতক্ষীরা) বিএম কলেজের পদার্থ বিভাগের আরেক মেধাবী ছাত্র কামনাশীষ মণ্ডলের। অতঃপর বিয়ে। কামনাশীষ টিউশনি করে সংসার চালাতেন।
পুলিশের এসআই হেলাল জানান, সোমবার মেয়েটির মামাশ্বশুর মতিলাল সরকার তার কাছে ফোন করে নগ্ন ভিডিওর বিষয়টি জানালে তিনি মামলা করার নির্দেশ দেন। সুপর্ণার পরীক্ষা চলছিল। গতকাল বিকালে পরীক্ষার পর মামলাটি দায়েরের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
সুপর্ণার মামাশ্বশুর মতিলাল জানান, সুপর্ণার ক্লাসফ্রেন্ড নয়ন প্রায়ই তাকে উত্ত্যক্ত করত। নয়নের বাড়ি ভোলার বোরহানউদ্দিনে। তার পিতা রফিকুল ইসলাম সৌদি প্রবাসী। বরিশালে দুলাভাই উত্তরা ব্যাংক কর্মকর্তা সাহাবুদ্দিন আহমেদের কাছে থেকে পড়াশোনা করে। বিবাহিতা জেনেও নয়ন নানা প্রস্তাব দিতো; যা সুপর্ণা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। মাস ছয়েক আগে সুপর্ণার কাছে নয়ন তার কৃতকর্মের জন্য মাফ চায় এবং শিশুপার্কে বিশেষ কাজে আসতে বলে। এরপর থেকে সে আর সুপর্ণাকে জ্বালাতন করবে না বলে মিনতি করে। সুপর্ণা তার কথা বিশ্বাস করে শিশুপার্কে গেলে নির্জন স্থানে নিয়ে সুপর্ণাকে কুপ্রস্তাব দেয়। তাকে নগ্ন হতে বলে এবং তার প্রস্তাবে রাজি হলে সে জীবনেও আর সুপর্ণাকে জ্বালাতন করবে না বলে অঙ্গীকার করে। বাধ্য হয়ে সুপর্ণা তার প্রস্তাবে রাজি হয় এবং চতুর নয়ন তা ভিডিও করে রাখে। পরে একাধিকবার এ ছবি দেখিয়ে সুপর্ণাকে কুপ্রস্তাব দিলেও সে রাজি হয়নি। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, তিনি ভিডিওটি গতকাল দেখেছেন। সেখানে ধর্ষণ দৃশ্য ছিল না। শুধু মাত্র মেয়েটির নগ্ন কয়েকটি দৃশ্য ছিল এবং মেয়েটির চোখ-মুখে ছিল আতঙ্ক। মাত্র এক থেকে দেড় মিনিটের ছিল ভিডিও ক্লিপটি। ৬ মাস আগে এ ঘটনাটি ঘটলেও এত দিন নয়ন তা নিজের কাছেই রাখে। সুপর্ণাকে কোনভাবে বাগে আনতে না পারায় ৩-৪ দিন আগে ভিডিও ক্লিপটি ব্লুটুথের মাধ্যমে সহপাঠীদের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। বিষয়টি সুপর্ণা টের পায়। স্বামী জানতে পারবে ভেবে অস্থির হয়ে ওঠে সে। ঘটনার দিন তার মামা শ্বশুর মতিলাল সরকারকে বাধ্য হয়ে ঘটনাটি বললে তিনি পুলিশকে জানান। কিন্তু রাতেই টের পেয়ে যায় তার স্বামী। এ নিয়ে রাত ৯টায় তাদের মধ্যে বাক্বিতণ্ডা হয়। এরপর স্বামী কামনাশীষ টিউশনিতে যায়। ফিরে এসে দেখে দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। ভেতরে কোন সাড়া শব্দ নেই। এ অবস্থায় প্রতিবেশীদের সাহায্য নিয়ে দরজা ভাঙা হলে দেখা যায় সুপর্ণা গলায় ওড়না দিয়ে ফাঁস লাগিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে আছে।
আত্মহত্যার পরপরই নগরীজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। পুলিশ জানতো অনার্স পরীক্ষা চলছে। কেন্দ্রের সামনে ওত পেতে বসে থাকে তারা। সকাল সাড়ে ৮টায় পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছা মাত্র নয়নকে আটক করা হয়। থানায় এসে জিজ্ঞাসাবাদ করলে প্রথমে সে সরকারদলীয় কর্মী বলে পরিচয় দিলে পুলিশ ভড়কে যায়। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, সে বিএম কলেজের কর্মপরিষদের ভিপি মইন তুষারের বন্ধু বলে দাবি করে। এ সময় পুলিশ বরিশালে এক শীর্ষ রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে কথা বললে তিনি আইনি ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানান। পুলিশের কাছে এরপর নয়ন সব কিছু স্বীকার করে। এস আই হেলাল জানান, নয়ন পুলিশের কাছে বলেছে সুপর্ণার সঙ্গে তার প্রেম ছিল। সুপর্ণাকে সে কাছে পেতেই ভিডিও করে বলে জানায়। আটক নয়নের সঙ্গে মোবাইল না থাকায় সেটি আনতে বলা হয়। নয়নের মামাতো ভাই রাজ্জাক মোবাইল নিয়ে এলেও তাতে মেমরি কার্ড না থাকায় রাজ্জাককেও পুলিশ আটক করে। তবে একটি সোর্স থেকে পুলিশ ভিডিও ক্লিপ উদ্ধার করে।
কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি জাহাঙ্গীর জানান, নয়নের বিস্তারিত তথ্য নেয়া হচ্ছে। আর মোবাইলের মেমোরি কার্ডটিও উদ্ধারের চেষ্টা চলছে।
এদিকে সুপর্ণার আকস্মিক আত্মহননে তার গণিত বিভাগের সতীর্থরা গতকাল পরীক্ষা দিতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়ে। গণিত বিভাগসহ গোটা ক্যাম্পাসে ছিল শোকের আবহ। গণিত বিভাগের প্রধান হিমাংশু শেখর বিশ্বাস জানান, অভিযুক্ত নজরুল ইসলাম নয়নকে বহিষ্কার করা হচ্ছে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন