বদরুল ইসলাম মাসুদ, বান্দরবান থেকে
বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম উপজেলার আদিবাসী ম্রো (মুরং) পাড়ায় হাম, ডায়রিয়া, বসন্ত (চিকেন পক্স) মহামারী আকারে ছড়িয়ে ২৩ শিশুর মৃত্যু ও দুই শতাধিক আক্রান্তের ঘটনার পর এবার লামা উপজেলায়তেও আদিবাসী মুরং পাড়ায় এসব রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত কয়েকদিনে লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের আমতলী, লেমুপালং ও দেওয়ান মুরং পাড়ায় হাম, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এরমধ্যে তিনদিনে আমতলী মুরং পাড়ায় একই
পরিবারের তিনজনসহ চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে দুই শতাধিক শিশু।
স'ানীয়ভাবে চারজনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও বান্দরবানের সিভিল সার্জন এবং লামা উপজেলা স্বাস'্য কর্মকর্তা তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। স্বাস'্য বিভাগ আক্রান্তের কথা ২৮ জন স্বীকার করে বলেছে, আক্রান্তদের লামা উপজেলা স্বাস'্য কমপ্লেক্সে (হাসপাতাল) এনে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে। চিকিৎসার ফলে ২৮ জনের সকলেই সুস' হয়ে উঠছে। এরমধ্যে শনিবার ১১ জনকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ (ছাড়) দেয়া হয়েছে। অন্য ১৭ জন এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। স্বাস'্য বিভাগ বলছে তারা আক্রান্ত এলাকায় ১১০ জনকে হাম, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার টিকাসহ চিকিৎসা সেবা দিয়েছে। স্বাস'্য বিভাগ আরো বলেছে, ইতিমধ্যে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিতে একটি করে ৬টি মেডিকেল টিম এবং সরই ইউনিয়নে অতিরিক্ত আরো ২টি মেডিকেল টিম গঠন করে রোগ শনাক্ত এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা প্রদান করার কাজ চলছে। তবে স'ানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে স্বাস'্য বিভাগের তথ্যের যথেষ্ট অমিল রয়েছে।
লামা উপজেলায় হাম, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডাঃ সাখাওয়াত হোসেন শনিবার এ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, ওই উপজেলার সরই ইউনিয়নের দুর্গম আদিবাসী মুরং অধ্যুষিত আমতলী, লেমুপালং এলাকায় হাম, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে আক্রান্তদের থেকে ২৮ জনকে লামা উপজেলা স্বাস'্য কমপ্লেক্সে (হাসপাতালে) ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়। চিকিৎসার ফলে ১১ জন পুরোপুরি সুস' হলে তাদের শনিবার হাসপাতাল থেকে ছাড় (রিলিজ) করা হয়। অন্যদের হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তিনি তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে বলেন, একজন শুক্রবার হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস'ায় মারা গেছে, অপর দুই শিশু গত ১০ মে নিজ বাড়িতে মারা গেছে। তিনি বলেন, স্বাস'্য বিভাগের ডাক্তার ও স্বাস'্যকর্মীরা আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রেখেছে।
লামা উপজেলা স্বাস'্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ শফিউর রহমানও শনিবার দুপুরে তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে জানান, আক্রান্তদের মধ্যে উপজেলা স্বাস'্য কমপ্লেক্সে যে ২৮জনকে ভর্তি করা হয়। এরমধ্যে ১১ জন সুস' হলে তাদের শনিবার রিলিজ দেয়া হয়, অন্য ১৭ জনের চিকিৎসা চলছে। তিনি জানান, এক থেকে ১০ বছরের ছেলে-মেয়েরাই আক্রান্ত হচ্ছে। তবে ২৮ বছরের এক যুবকও হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি আরো জানান, উপজেলার সরই ইউনিয়নে নিউমোনিয়া, হাম ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ১১০ জনকে এ পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধক টিকাসহ চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত একটি মেডিকেল টিমসহ অতিরিক্ত আরো দুটি মেডিকেল টিম এলাকায় অবস'ান করে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তিনি জানান, চিকিৎসা সেবার ফলে আক্রান্তরা সুস' হয়ে উঠছে ও নতুন করে কেউ আক্রান্ত হচ্ছে না। তিনি জানান, প্রচন্ড গরম, বৈরী আবহাওয়া এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে মুরং জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে হাম, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া রোগ দেখা দিচ্ছে।
এদিকে উপজেলার সরই ইউনিয়ন ছাড়াও গজালিয়া, রূপসীপাড়া, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নেও হাম, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলা স্বাস'্য কমকর্তা রূপসীপাড়া ও গজালিয়া ইউনিয়নে এসব রোগ ছড়িয়ে পড়ার কথা স্বীকার করে বলেন, উপজেলার প্রত্যেক ইউনিয়নেই একটি করে মেডিকেল টিম গঠন করে দেয়া হয়েছে। তারা সেখানে রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য কাজ করছে। তিনি জানান, এসব কাজে লামার স'ানীয় এনজি এনজেড একতা মহিলা সমিতি ও ইউএনডিপি’র চিকিৎসা টিমের সদস্যরাও কাজ করছে।
উপজেলা স্বাস'্য কর্মকর্তা এ রোগ সম্পর্কে বলেন, আক্রান্তরা জ্বরে ভোগার পর শরীরে এক ধরণের লাল গোটার মত দেখা দেয়। কিছু রোগী নিউমোনিয়াও আক্রান্ত হচ্ছে। তবে রোগটি ‘হাম’ কিনা নিশ্চিত হতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে স্বাস'্য বিভাগের দেয়া তথ্যের সাথে স'ানীয়দের দেয়া তথ্যের যথেষ্ট অমিল রয়েছে। সরই ইউনিয়নের আমতলী পাড়ার মোরাউ মুরং স'ানীয় সাংবাদিকদের জানান, গত মঙ্গলবার (১০ মে) তার ৭ বছরের মেয়ে চংসাই মুরং, ৬ বছরের মেয়ে চামরুং ও ২ বছরের ছেলে মেনপ্রে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে লামা হাসপাতালে ভর্তি হয়, চিকিৎসাধীন অবস'ায় বৃহস্পতিবার রাতে তারা মারা যায়। এছাড়ার গত রোববার রাতে একই পাড়ার ইয়ংরিং মুরং এর ৫ বছরের ছেলে মেনতন মুরং মারা যায়। আমতলী পাড়া প্রধান (কারবারী) মেনপয় মুরং সাংবাদিকদের জানান, হাম রোগের আমতলী ও দেওয়ান পাড়ায় অর্ধশতাধিক শিশু আক্রান্ত হয়েছে।
লামার এনজিও এনজেড একতা মহিলা সমিতির কর্মসূচি পরিচালক অজিত দাশ সাংবাদিকদের জানান, হাম রোগের কথা শুনে বুধবার তাদের সংগঠন (একতা সমিতি) ও ইউএনডিপির ৬ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম আক্রান্ত পাড়ায় গিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। আক্রান্তদের মধ্যে মারাত্মক অবস'ায় ৩১ জনকে লামা স্বাস'্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। উপজেলার রূপসী পাড়া ইউনিয়নের কম্পংপাড়ার লম্পা মুরং ও মানপ্রু মুরং সাংবাদিকদের জানান, তাদের ইউনিয়নেও হাম, ডায়রিয়া রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। তারা জানায়, এরমধ্যে কম্পং পাড়ায় ২৫ জন, লুলেং পাড়ায় ১৬, অমই পাড়ায় ১৫, বলু পাড়ায় ৩০ জন আক্রান্ত হয়েছে। তারাসহ স'ানীয় অনেকেই অভিযোগ করেন, দুর্গম ও আদিবাসী অধ্যুষিত এসব পাড়ায় ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) ও বিশুদ্ধ পানির আওতায় না আনায় এসকল পাড়ায় শিশুরা হামসহ ৬টি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত মাসের (এপ্রিল) মাঝামাঝি জেলার লামা উপজেলা সংলগ্ন আলীদকম উপজেলার দুর্গম মুরং অধ্যুষিত পোয়ামুরীর ১১টি পাড়ায় হাম, ডায়রিয়া ও বসন্ত (চিকেন পক্স) মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এসব রোগে ওইসব পাড়ার ২৩ শিশুর মৃত্যু হয়, আক্রান্ত হয় দুই শতাধিক। তবে এলাকায় কাজ করা সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিম ১৭ জনের মৃত্যুর খবর স্বীকার করে এবং ১১২ জনকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। এ সময় সেনাবাহিনী স্বাস'্য বিভাগের ৪টি মেডিকেল টিম আলীকদমের পোয়ামুরীর ১১টি পাড়ায় চিৎিসা সেবা প্রদান করে। এছাড়া এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে জেলার রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের বিল পাড়াতেও ডায়রিয়া ও হামে তিন শিশুর মৃত্যু হয়।
এদিকে জেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে হাম, ডায়রিয়া, বসন্ত রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে ৩০ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু ও চারশতাধিক আক্রান্ত হওয়ার পরও সরকারিভাবে কোনো প্রেস ব্রিফিং এর ব্যবস'া করা হয়নি। ফলে সংবাদকর্মীরা সঠিক ও বস'নিষ্ঠ সংবাদ পেতে ও নিজ নিজ মিডিয়ায় প্রেরণ করতে বিপাকে পড়ছে। নিজ উদ্যোগে এলাকার লোকজন, জনপ্রতিনিধি ও পাড়া প্রধানদের থেকে যা তথ্য পায় তার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। স্বাস'্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা সঠিক তথ্য দিতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা এ সম্পর্কে অবহিতও নন। গত সপ্তাহে লামার সরই ইউনিয়নে হাম ও ডায়রিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না’ বলে বলেন, আমাকে স্পেসিফিক করে বলেন তো কোন কোন পাড়ায় এসব রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।’ এপ্রিল মাসে আলীকদম উপজেলার পোয়ামুরীতে হাম, ডায়রিয়া ও বসন্ত রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর উপজেলা স্বাস'্য কর্মকর্তার অফিসিয়াল মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এসব কারণে গুরুতর এসব রোগে লোকজনের মধ্যে উদ্বেগ ও ভুল-বিভ্রান্তিকর তথ্যও প্রকাশ হয়ে আতংক ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। লামার সরইয়ে হাম, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় মৃত্যু ও আক্রান্ত হওয়ার বিষয়েও স্বাস'্য বিভাগের প্রদত্ত তথ্যের সাথে স'ানীয়দের দেয়া তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এতেও সংবাদকর্মীরা বিভ্রান্তি পড়ে। স্বাস'্য বিভাগ কিংবা প্রশাসন থেকে এসব বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং দেয়া না হলে বিভ্রান্তিকর তথ্য এসে পরিসি'তি ভিন্ন খাতে চলে যেতে পারে বলেও সংবাদকর্মীরা মনে করছেন। এ ব্যাপারে লামা উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইলের সাথে শনিবার যোগাযোগ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, তার উপজেলায় প্রেস ব্রিফিং এর প্রয়োজন নেই। চিকিৎসা টিমই যথেষ্ট। তারাই জনগণকে সচেতন করে তুলছেন।
বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলীকদম উপজেলার আদিবাসী ম্রো (মুরং) পাড়ায় হাম, ডায়রিয়া, বসন্ত (চিকেন পক্স) মহামারী আকারে ছড়িয়ে ২৩ শিশুর মৃত্যু ও দুই শতাধিক আক্রান্তের ঘটনার পর এবার লামা উপজেলায়তেও আদিবাসী মুরং পাড়ায় এসব রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে।
গত কয়েকদিনে লামা উপজেলার সরই ইউনিয়নের আমতলী, লেমুপালং ও দেওয়ান মুরং পাড়ায় হাম, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এরমধ্যে তিনদিনে আমতলী মুরং পাড়ায় একই
পরিবারের তিনজনসহ চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে দুই শতাধিক শিশু।
স'ানীয়ভাবে চারজনের মৃত্যুর কথা বলা হলেও বান্দরবানের সিভিল সার্জন এবং লামা উপজেলা স্বাস'্য কর্মকর্তা তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। স্বাস'্য বিভাগ আক্রান্তের কথা ২৮ জন স্বীকার করে বলেছে, আক্রান্তদের লামা উপজেলা স্বাস'্য কমপ্লেক্সে (হাসপাতাল) এনে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে। চিকিৎসার ফলে ২৮ জনের সকলেই সুস' হয়ে উঠছে। এরমধ্যে শনিবার ১১ জনকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ (ছাড়) দেয়া হয়েছে। অন্য ১৭ জন এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। স্বাস'্য বিভাগ বলছে তারা আক্রান্ত এলাকায় ১১০ জনকে হাম, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ার টিকাসহ চিকিৎসা সেবা দিয়েছে। স্বাস'্য বিভাগ আরো বলেছে, ইতিমধ্যে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের প্রত্যেকটিতে একটি করে ৬টি মেডিকেল টিম এবং সরই ইউনিয়নে অতিরিক্ত আরো ২টি মেডিকেল টিম গঠন করে রোগ শনাক্ত এবং আক্রান্তদের চিকিৎসা প্রদান করার কাজ চলছে। তবে স'ানীয়দের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের সাথে স্বাস'্য বিভাগের তথ্যের যথেষ্ট অমিল রয়েছে।
লামা উপজেলায় হাম, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ও মৃত্যুর বিষয়ে জানতে চাইলে বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডাঃ সাখাওয়াত হোসেন শনিবার এ প্রতিনিধিকে জানিয়েছেন, ওই উপজেলার সরই ইউনিয়নের দুর্গম আদিবাসী মুরং অধ্যুষিত আমতলী, লেমুপালং এলাকায় হাম, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি জানান, ইতিমধ্যে আক্রান্তদের থেকে ২৮ জনকে লামা উপজেলা স্বাস'্য কমপ্লেক্সে (হাসপাতালে) ভর্তি করে চিকিৎসা দেয়া হয়। চিকিৎসার ফলে ১১ জন পুরোপুরি সুস' হলে তাদের শনিবার হাসপাতাল থেকে ছাড় (রিলিজ) করা হয়। অন্যদের হাসপাতালে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। তিনি তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে বলেন, একজন শুক্রবার হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস'ায় মারা গেছে, অপর দুই শিশু গত ১০ মে নিজ বাড়িতে মারা গেছে। তিনি বলেন, স্বাস'্য বিভাগের ডাক্তার ও স্বাস'্যকর্মীরা আক্রান্তদের চিকিৎসা সেবা অব্যাহত রেখেছে।
লামা উপজেলা স্বাস'্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ডাঃ শফিউর রহমানও শনিবার দুপুরে তিনজনের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে জানান, আক্রান্তদের মধ্যে উপজেলা স্বাস'্য কমপ্লেক্সে যে ২৮জনকে ভর্তি করা হয়। এরমধ্যে ১১ জন সুস' হলে তাদের শনিবার রিলিজ দেয়া হয়, অন্য ১৭ জনের চিকিৎসা চলছে। তিনি জানান, এক থেকে ১০ বছরের ছেলে-মেয়েরাই আক্রান্ত হচ্ছে। তবে ২৮ বছরের এক যুবকও হামে আক্রান্ত হয়েছে বলে তিনি জানান। তিনি আরো জানান, উপজেলার সরই ইউনিয়নে নিউমোনিয়া, হাম ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত ১১০ জনকে এ পর্যন্ত রোগ প্রতিরোধক টিকাসহ চিকিৎসা সেবা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত একটি মেডিকেল টিমসহ অতিরিক্ত আরো দুটি মেডিকেল টিম এলাকায় অবস'ান করে রোগ শনাক্ত ও চিকিৎসা কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। তিনি জানান, চিকিৎসা সেবার ফলে আক্রান্তরা সুস' হয়ে উঠছে ও নতুন করে কেউ আক্রান্ত হচ্ছে না। তিনি জানান, প্রচন্ড গরম, বৈরী আবহাওয়া এবং বিশুদ্ধ পানির অভাবে মুরং জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে হাম, ডায়রিয়া, নিউমোনিয়া রোগ দেখা দিচ্ছে।
এদিকে উপজেলার সরই ইউনিয়ন ছাড়াও গজালিয়া, রূপসীপাড়া, ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নেও হাম, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া ছড়িয়ে পড়েছে। উপজেলা স্বাস'্য কমকর্তা রূপসীপাড়া ও গজালিয়া ইউনিয়নে এসব রোগ ছড়িয়ে পড়ার কথা স্বীকার করে বলেন, উপজেলার প্রত্যেক ইউনিয়নেই একটি করে মেডিকেল টিম গঠন করে দেয়া হয়েছে। তারা সেখানে রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসার জন্য কাজ করছে। তিনি জানান, এসব কাজে লামার স'ানীয় এনজি এনজেড একতা মহিলা সমিতি ও ইউএনডিপি’র চিকিৎসা টিমের সদস্যরাও কাজ করছে।
উপজেলা স্বাস'্য কর্মকর্তা এ রোগ সম্পর্কে বলেন, আক্রান্তরা জ্বরে ভোগার পর শরীরে এক ধরণের লাল গোটার মত দেখা দেয়। কিছু রোগী নিউমোনিয়াও আক্রান্ত হচ্ছে। তবে রোগটি ‘হাম’ কিনা নিশ্চিত হতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
এদিকে স্বাস'্য বিভাগের দেয়া তথ্যের সাথে স'ানীয়দের দেয়া তথ্যের যথেষ্ট অমিল রয়েছে। সরই ইউনিয়নের আমতলী পাড়ার মোরাউ মুরং স'ানীয় সাংবাদিকদের জানান, গত মঙ্গলবার (১০ মে) তার ৭ বছরের মেয়ে চংসাই মুরং, ৬ বছরের মেয়ে চামরুং ও ২ বছরের ছেলে মেনপ্রে হাম রোগে আক্রান্ত হয়ে লামা হাসপাতালে ভর্তি হয়, চিকিৎসাধীন অবস'ায় বৃহস্পতিবার রাতে তারা মারা যায়। এছাড়ার গত রোববার রাতে একই পাড়ার ইয়ংরিং মুরং এর ৫ বছরের ছেলে মেনতন মুরং মারা যায়। আমতলী পাড়া প্রধান (কারবারী) মেনপয় মুরং সাংবাদিকদের জানান, হাম রোগের আমতলী ও দেওয়ান পাড়ায় অর্ধশতাধিক শিশু আক্রান্ত হয়েছে।
লামার এনজিও এনজেড একতা মহিলা সমিতির কর্মসূচি পরিচালক অজিত দাশ সাংবাদিকদের জানান, হাম রোগের কথা শুনে বুধবার তাদের সংগঠন (একতা সমিতি) ও ইউএনডিপির ৬ সদস্যের একটি মেডিকেল টিম আক্রান্ত পাড়ায় গিয়ে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। আক্রান্তদের মধ্যে মারাত্মক অবস'ায় ৩১ জনকে লামা স্বাস'্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করানো হয়। উপজেলার রূপসী পাড়া ইউনিয়নের কম্পংপাড়ার লম্পা মুরং ও মানপ্রু মুরং সাংবাদিকদের জানান, তাদের ইউনিয়নেও হাম, ডায়রিয়া রোগ ছড়িয়ে পড়েছে। তারা জানায়, এরমধ্যে কম্পং পাড়ায় ২৫ জন, লুলেং পাড়ায় ১৬, অমই পাড়ায় ১৫, বলু পাড়ায় ৩০ জন আক্রান্ত হয়েছে। তারাসহ স'ানীয় অনেকেই অভিযোগ করেন, দুর্গম ও আদিবাসী অধ্যুষিত এসব পাড়ায় ইপিআই (সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি) ও বিশুদ্ধ পানির আওতায় না আনায় এসকল পাড়ায় শিশুরা হামসহ ৬টি মারাত্মক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।
প্রসঙ্গত, এর আগে গত মাসের (এপ্রিল) মাঝামাঝি জেলার লামা উপজেলা সংলগ্ন আলীদকম উপজেলার দুর্গম মুরং অধ্যুষিত পোয়ামুরীর ১১টি পাড়ায় হাম, ডায়রিয়া ও বসন্ত (চিকেন পক্স) মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ে। এসব রোগে ওইসব পাড়ার ২৩ শিশুর মৃত্যু হয়, আক্রান্ত হয় দুই শতাধিক। তবে এলাকায় কাজ করা সেনাবাহিনীর মেডিকেল টিম ১৭ জনের মৃত্যুর খবর স্বীকার করে এবং ১১২ জনকে চিকিৎসা সেবা প্রদান করে। এ সময় সেনাবাহিনী স্বাস'্য বিভাগের ৪টি মেডিকেল টিম আলীকদমের পোয়ামুরীর ১১টি পাড়ায় চিৎিসা সেবা প্রদান করে। এছাড়া এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে জেলার রুমা উপজেলার পাইন্দু ইউনিয়নের বিল পাড়াতেও ডায়রিয়া ও হামে তিন শিশুর মৃত্যু হয়।
এদিকে জেলার দুর্গম এলাকাগুলোতে হাম, ডায়রিয়া, বসন্ত রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে ৩০ জনের বেশি শিশুর মৃত্যু ও চারশতাধিক আক্রান্ত হওয়ার পরও সরকারিভাবে কোনো প্রেস ব্রিফিং এর ব্যবস'া করা হয়নি। ফলে সংবাদকর্মীরা সঠিক ও বস'নিষ্ঠ সংবাদ পেতে ও নিজ নিজ মিডিয়ায় প্রেরণ করতে বিপাকে পড়ছে। নিজ উদ্যোগে এলাকার লোকজন, জনপ্রতিনিধি ও পাড়া প্রধানদের থেকে যা তথ্য পায় তার উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। স্বাস'্য বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা সঠিক তথ্য দিতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে তারা এ সম্পর্কে অবহিতও নন। গত সপ্তাহে লামার সরই ইউনিয়নে হাম ও ডায়রিয়ার মৃত্যুর খবর পেয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না’ বলে বলেন, আমাকে স্পেসিফিক করে বলেন তো কোন কোন পাড়ায় এসব রোগ ছড়িয়ে পড়েছে।’ এপ্রিল মাসে আলীকদম উপজেলার পোয়ামুরীতে হাম, ডায়রিয়া ও বসন্ত রোগ মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ার পর উপজেলা স্বাস'্য কর্মকর্তার অফিসিয়াল মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। এসব কারণে গুরুতর এসব রোগে লোকজনের মধ্যে উদ্বেগ ও ভুল-বিভ্রান্তিকর তথ্যও প্রকাশ হয়ে আতংক ছড়িয়ে পড়ার আশংকা রয়েছে। লামার সরইয়ে হাম, ডায়রিয়া ও নিউমোনিয়ায় মৃত্যু ও আক্রান্ত হওয়ার বিষয়েও স্বাস'্য বিভাগের প্রদত্ত তথ্যের সাথে স'ানীয়দের দেয়া তথ্যের মিল পাওয়া যাচ্ছে না। এতেও সংবাদকর্মীরা বিভ্রান্তি পড়ে। স্বাস'্য বিভাগ কিংবা প্রশাসন থেকে এসব বিষয়ে প্রেস ব্রিফিং দেয়া না হলে বিভ্রান্তিকর তথ্য এসে পরিসি'তি ভিন্ন খাতে চলে যেতে পারে বলেও সংবাদকর্মীরা মনে করছেন। এ ব্যাপারে লামা উপজেলা চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ইসমাইলের সাথে শনিবার যোগাযোগ করে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, তার উপজেলায় প্রেস ব্রিফিং এর প্রয়োজন নেই। চিকিৎসা টিমই যথেষ্ট। তারাই জনগণকে সচেতন করে তুলছেন।

কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন