ইউএনটি
বাংলাদেশের মানচিত্রের দক্ষিণের শেষবিন্দু, এর পর দেশের আর কোনো ভূখণ্ড নেই। সাগরের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা বিচ্ছিন্ন প্রবালদ্বীপ সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ইউনিয়নের আরেকটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ ছেঁড়াদিয়া। এ দ্বীপে এখনো জনবসতি গড়ে ওঠেনি। কিন্তু পর্যটকদের পছন্দের এক নম্বর জায়গা হচ্ছে ছেঁড়াদিয়া। সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে গিয়ে ছেঁড়াদিয়া না দেখে সম্ভবত কেউ ফেরেন না।
কী আছে এ দ্বীপে? জীববিজ্ঞানীদের তথ্যমতে, জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এ দ্বীপে রয়েছে ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল, ১৫৭ প্রজাতির জলজউদ্ভিদ, ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৫৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ২৪০ প্রজাতির মাছ, চার প্রজাতির উভচর ও ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ প্রাণী। দ্বীপটি ভ্রমণের সময় কোমরসমান স্বচ্ছ পানিতে নামলে পাথরের স্তূপের ওপর নানা প্রজাতির প্রবাল, শৈবাল, শামুক-ঝিনুক ও অসংখ্য প্রজাতির মাছ ও জলজপ্রাণী দেখা যায়। দ্বীপটির বালুচরজুড়ে ভরপুর থাকে নানা ধরনের শামুক-ঝিনুক। ভাটার সময় দ্বীপের চারদিকে ভেসে ওঠা পাথরের ওপর বিভিন্ন প্রজাতির প্রবাল পড়ে থাকতে দেখা যায়।
পরিবেশ অধিদপ্তর টেকনাফ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য কর্মকর্তা এ বি এম আমিনুল হক জানান, পর্যটকের চাপ বেড়ে যাওয়ায় ছেঁড়াদিয়া দ্বীপের পরিবেশও বিনষ্ট হচ্ছে। দ্বীপের চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা প্রবাল, শৈবাল ও শামুক-ঝিনুকগুলো আহরিত হওয়ায় জীববৈচিত্র্যও ধ্বংস হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে পর্যটকের যাতায়াত সীমিত অথবা নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। সরকার এ লক্ষ্যে কাজ করছে।
পায়ে হেঁটে ছেঁড়াদিয়া: সাগরে ভাটার সময় দ্বীপের চারদিকে শামুক-ঝিনুক ও প্রবালে ভরা সোনালি বালুচর ভেসে ওঠে। দ্বীপের পূর্ব-পশ্চিম, দক্ষিণ ও উত্তর অংশে বিশাল বিশাল প্রবালের স্তূপ সবার নজর কাড়ে। পূর্ণভাটা হলে এ দ্বীপের উত্তর অংশে ভেসে ওঠা প্রবাল পাথরের ওপর দিয়ে হেঁটে হেঁটে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে আসা-যাওয়া করা যায়। সময় লাগে তিন-চার ঘণ্টা। অভিজ্ঞতা বাড়াতে ভ্রমণে আসা পর্যটকেরা এ পথে যাতায়াতের অপেক্ষায় থাকেন। দ্বীপটির মোট আয়তন কত, এ হিসাব দ্বীপের কোথাও নেই। তবে সেন্ট মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমদ খান জানান, ছেঁড়াদিয়া দ্বীপের আয়তন জোয়ারের সময় এক বর্গকিলোমিটার আর ভাটার সময় প্রায় দুই বর্গকিলোমিটার। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা বলে এ দ্বীপে এখনো লোকবসতি গড়ে ওঠেনি। দ্বীপটি সরকারি মালিকানাধীন।
চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজের ছাত্র ইব্রাহিম খলিল (২৩) জানান, সেন্ট মার্টিনের দক্ষিণ অংশ দিয়ে হেঁটে হেঁটে ছেঁড়াদিয়া যাওয়ার মজাই আলাদা। এ সময় প্রবাল পাথরে লুকিয়ে থাকা হাজার প্রজাতির মাছের দুর্লভ দৃশ্য দেখা যায়।
নিষ্ঠুরতায় ক্ষত-বিক্ষত ছেঁড়াদিয়া: সেন্ট মার্টিন থেকে ছোট ছোট ট্রলার ও স্পিডবোটে করে প্রতিদিন গড়ে ২০০ পর্যটক ছেঁড়াদ্বীপে আসেন। বেশির ভাগ পর্যটক হাঁটুসমান নীল জলের স্বচ্ছ পানিতে নেমে প্রবাল, শৈবাল ও শামুক-ঝিনুক সংগ্রহ করেন। হরেক রঙের মাছ ধরতে ছোটাছুটি করেন। জলে-স্থলে-আকাশে দেখা মেলে নানা প্রজাতির পাখির বিচরণ। সরেজমিনে দ্বীপে গিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রত্যয় নামে একটি বেসরকারি সংস্থার তিনটি নির্দেশনাফলক (সাইনবোর্ড) নজরে পড়লেও তাঁদের কাউকে দ্বীপে দেখা যায়নি। ছোট্ট দ্বীপটিও পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, ডাবের খোসায় ভরা। বালুচরে হাঁটার সময় এসব ময়লা-আবর্জনা বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্থানীয় মাছ বিক্রেতা আবদুল শুক্কুর জানান, পর্যটকেরা ফিরে যাওয়ার সময় ছেঁড়াদিয়া থেকে বিপুল পরিমাণ প্রবাল-শৈবাল তুলে নিয়ে যান। নিষেধ করলেও তাঁরা শোনেন না।
ছেঁড়াদিয়া দ্বীপ ভ্রমণ শেষে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা এ প্রতিবেদককে আক্ষেপের সুরে বলেন, একেবারে দুর্গম ও গভীর সাগরের মধ্যে থেকেও সুন্দর এ দ্বীপটি রক্ষা পাচ্ছে না। মানুষের নিষ্ঠুরতায় হারিয়ে ফেলছে তার ঐতিহ্য।
সেন্ট মার্টিনও দূষণের কবলে: সাত বর্গকিলোমিটার আয়তনের সেন্ট মার্টিন দ্বীপটিও দূষণের কবলে পড়েছে। এর একমাত্র কারণ ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত লোকসমাগম। শীত মৌসুমে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার পর্যটক এ দ্বীপে ভ্রমণ করেন। দ্বীপে গড়ে উঠেছে দেড় শতাধিক আবাসিক হোটেল, মোটেল ও কটেজ।
দ্বীপের বাসিন্দা নুরুল আলম (৪২) জানান, সম্প্রতি দ্বীপে পানিসংকট দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন নলকূপে লোনা পানি আসছে। এ নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন।
সরকারের একটি পরিবেশগত নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাত্রাতিরিক্ত পর্যটকের উপস্থিতির পাশাপাশি তাঁদের অনিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ডে দ্বীপটির পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা ও আবর্জনা সমস্যা চরম আকার ধারণ করেছে। দ্বীপটিতে উদ্বেগজনক হারে বসতি স্থাপন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার হওয়ায় পানীয়জলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। নষ্ট হচ্ছে পরিবেশ-প্রতিবেশ। একসময় দ্বীপে অনেক পশুপাখি ছিল। বর্তমানে তা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সামুদ্রিক কাছিম, প্রবাল, শামুক, ঝিনুক, বালিয়াড়ি, লতাসহ নানা ধরনের বৈচিত্র্যও এখন বিলুপ্তির পথে।
পরিবেশ অধিদপ্তর টেকনাফ অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য কর্মকর্তা এ বি এম আমিনুল হক জানান, ব্যাপকভাবে পাথর আহরণ করায় পুরো দ্বীপ এখন হুমকির মুখে পড়েছে। সৈকতের পাড় ও ফসলি জমি থেকে পাথর খুঁড়ে নেওয়ায় ঝুঁকি ও স্থায়িত্ব কমে যাচ্ছে। পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাব ও আবর্জনার কারণে দ্বীপের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। এসব বর্জ্য সাগরে মিশে ধ্বংস হচ্ছে জীববৈচিত্র্যও।
(আব্দুল কুদ্দুস,) প্রথম আলো
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন