সর্বশেষ সংবাদ

আপনার প্রিয় উখিয়া নিউজ শীঘ্রই নতুন নামে আত্নপ্রকাশ করতে যাচ্ছে...UNC............ www.ukhianews.com

পলিটিক্স-৬

রাষ্ট্র ও সরকার নিয়েই জাতীয় রাজনীতি। রাষ্ট্র বা মানচিত্রের সর্বোচ্চ প্রতিক রাষ্ট্রপতি এবং সর্বনিু প্রতিক ইউনিয়ন পরিষদের সচিব। সরকার বা জনগণের সর্বোচ্চ প্রতিক প্রধানমন্ত্রী এবং সর্বনিু প্রতিক ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার। রাষ্ট্র যেমন দীর্ঘস্থায়ী, তেমনি এর কর্মচারীরাও মোটামোটি দীর্ঘস্থায়ী। সরকার যেমন ক্ষণস্থায়ী, তেমনি এর নীতিনির্ধারকরাও ক্ষণস্থায়ী। রাষ্ট্র হচ্ছে বিমানের মত এবং সরকার হচ্ছে পাইলটের মত। তাই পাইলট অসুস্থ হলে পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু মাঝ পথে বিমান খারাপ
হয়ে গেলে পরিবর্তন করা যায় না। বিমান খারাপ হলে পাইলট যতই ভাল হোক বিমান চলবে না, তেমনি পাইলট অসুস্থ বা অদক্ষ হলে বিমান যতই ভাল হোক দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তাই প্রথমে সমস্যা কোথায় তা খুজে বের করতে হবে এবং সে মোতাবেক পূর্বাপর ব্যবস্থা নিতে হবে।

জনগণ সরকারের কাছ থেকে অনেক কিছুই আশা করে। পরে হতাশ হয়ে সরকার পরিবর্তন করতে চায়। সমস্যার আশানুরুপ সমাধান না পেয়ে মানুষ দৌড়ায় একবার এ দিকে, আরেকবার ঐ দিকে। ফলে জোয়ার-ভাটার সৃষ্টি হয় একবার এ দলে, আরেকবার ঐ দলে। মরিচিকার পেছনে এ দৌড় যেন শেষ হবার নয়। কারণ দেশে এমন অনেক সমস্যা আছে যা শুধু সরকার বদলালেই সমাধান হবে না, যদি রাষ্ট্রীয় নীতি বদলানো না যায়, যদিও তা বদলাতে হবে সরকারকেই। যেমন, পরনির্ভরশীল বাজেট ও ঋণপর্বত। ভ্যাটযুক্ত বাজার ব্যবস্থা ও দ্রব্যমূল্য। সুদী অর্থনীতি ও মুদ্রাস্ফিতি। আমলাতান্ত্রীক প্রশাসন ও দূর্নীতি। শামুকগতির বিচার ব্যবস্থা ও নীরাপত্তাহীনতা। নিয়ন্ত্রণহীন রাজনীতি ও জানমালের ক্ষয়ক্ষতি। চাকুরীমূখী শিক্ষা ব্যবস্থা ও বেকারত্ব। অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও খাদ্য ঘাটতি। ইত্যাদি বিষয়ে নীতিগত তেমন বড় কোন পার্থক্য না থাকায় আওয়ামী লীগ-বিএনপির মধ্যে ক্ষমতার পালাবদল হলেও এ সব ক্ষেত্রে তেমন কোন পরিবর্তন দেখা যায় না। কিন্তু কোন বিকল্প শক্তি না থাকায় তাদের উপরেই ভরসা করতে বাধ্য হয় সবাই। তাই তাদের উচিত, এ ভরসার মর্যাদা রক্ষা করা এবং জনসম্পৃক্ত বিষয়ের প্রতি মনোযোগ দেয়া। সাধারণ মানুষ সংবিধান সংশোধন বা মধ্যবর্তী নির্বাচন বুঝে না, বুঝে পেটের ক্ষুধা এবং জানের ভয়।

ধার করে ঘি খেতে খেতে এ দেশের ভিটেমাটি নিলাম হওয়ার অবস্থা হয়েছে, তারপরও প্রতিবছর বাজেট প্রণয়ণ করা হয় বিদেশী সুদী ঋণ নিয়ে, যার অধিকাংশই যায় দুর্নীতিবাজদের পকেটে। কিন্তু ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে জাতির ঘাড়ে, যার পরিমান জনপ্রতি ১২ হাজার ডলারেরও বেশি। যার মূল অংশ বকেয়া রেখে সুদ পরিশুধ করতে হয় শ্রমিকদের কষ্টার্জিত বৈদেশিক মুদ্রায়। যারা বাজেটের নামে এ ভাবে দেশকে বিদেশের কাছে বন্ধক রাখে, তারা আর যাই করুক দেশ-জাতির কল্যাণ করতে পারে না।

সরকার একদিকে ভ্যাট বসিয়ে দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দেয়, অন্যদিকে ভর্তূকী দিয়ে দ্রব্যমূল্য কমানোর চেষ্টা করে। এর ফলে দরিদ্রদেরকেও বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়, আবার ধনীরাও অপ্রয়োজনে ছাড় পায়। এতে ধনীরা তেমন উপকৃত না হলেও দরিদ্ররা ভুক্তভূগী হয় মারাত্তক ভাবে। সরকারী ওএমএস-এর চাল সংগ্রহ করতেই দরিদ্রদের কর্ম দিবস নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু যদি সরকার প্রয়োজনীয় পণ্যের উপর থেকে ভ্যাট বাদ দিয়ে শুধুমাত্র ৫% থেকে ৫০% পর্যন্ত ইনকাম ট্যাক্স নিয়েই সন্তুষ্ট থাকত, তবে দ্রব্যমূল্য প্রায় অর্ধেকে নেমে আসত। ভর্তূকীর বদলে স্রষ্টা কর্তৃক বাধ্যকৃত জাকাত বাধ্যতামূলক আদায় ও বন্টন করতে “জাকাত ব্যাংক” প্রতিষ্ঠা করলে সকলেই সন্তুষ্ট চিত্তে তা প্রদান করত এবং সবাই উপকৃত হত। তবে সরকার নিজেও দারিদ্র বিমোচন করতে পারে না এবং স্রষ্টার দেয়া নিয়মও গ্রহণ করে না পশ্চিমারা মাইন্ড করার ভয়ে।

সুদ ও মুনাফা এক কথা নয়। সুদের কারণে পুঁজিপতির পুঁিজ বাড়ে এবং অভাবীর অভাব বাড়ে। মুনাফা করতে গিয়ে ঝুকি ও কর্মসংস্থান বাড়ে এবং বেকারত্ব ও অলসতা কমে। সুদী অর্থব্যবস্থায় মুদ্রাস্ফিতি ঘটা বা ধস নামা বা দেওলিয়া হওয়া অতি সহজ। কিন্তু মুনাফা ভিত্তিক অর্থব্যবস্থায় লাভ-ক্ষতি সবার উপর ভাগ হওয়ায় যে কোন ঝুকি মোকাবিলা করার ক্ষমতা অনেক বেশি থাকে। সৌদি আরব, ইরান, মালয়েশিয়াসহ অনেক রাষ্ট্র সুদমুক্ত অর্থব্যবস্থা চালু করায় একেক দেশ একেক দিক দিয়ে উন্নতির শিখরে পৌছে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা বিগত ৪০ বছরেও অর্থনৈতিক ভাবে স্বনির্ভরতা অর্জন বা কোন দিকেই অগ্রসর হতে পারিনি সুদী অর্থ ব্যবস্থার কারণেই।

সরকার পরিবর্তন করা সহজ, কিন্তু রাষ্ট্রীয় রিতিনীতি পরিবর্তন করা কঠিন। এ দেশের শাসননীতি, বিচারনীতি, শিক্ষানীতি, অর্থনীতি, রাজনীতি, সংবিধান সবকিছুই চলছে বৃটিশদের দেয়া নিয়মে। মাঝেমধ্যে নগন্য কিছু যোগবিয়োগ হয় মাত্র। ফলে ভৌগলিক ভাবে স্বাধীন হলেও এখনো আমরা অনেক বিষয়েই স্বাধীন সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। যেমন পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা উপস্থিতি এবং খনিজ সম্পদের উত্তোলন ও ব্যবহার। আমরা চাহিদামত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলেও চাকুরীমূখী শিক্ষার মাধ্যমে বেকার সৃষ্টি করে যাচ্ছি। নিজস্ব আইনে পরিচালিত থানা-কোর্টে প্রত্যাশিত প্রতিকার পাওয়া যায় না বলে ক্রসফায়ার ও গণপিঠুনিতে বিনাবিচারে মানুষ হত্যা করছি। যথাসময়ে উত্তরাধিকার সম্পদ বন্টন না করে একদিকে এতীম ও নারীদেরকে ঠকাচ্ছি, অন্যদিকে আদালতে সময়মত বিচার না পেয়ে এক শতক জমির জন্য দশ শতক হারাচ্ছি। মামলা জটে বিচার ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার উপক্রম হলেও আমরা অন্যকাজে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছি। এ দেশে একের কাজ চলে অন্যখানে। পল্টন সংসদে। সংসদ আদালতে। আদালত র‌্যাব-পুলিশের ক্রসফায়ারে। বিচারক সরকারে। আইনসভায় ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ে বিডিআর। বিডিআর কারাগারে। সীমান্ত বিএসএফের পাহারায়। প্রতিরক্ষা জাতিসংঘে। জাতিসংঘ পার্বত্য চট্টগ্রামে। রাষ্ট্রপ্রধান সেনাক্যাম্পে। সেনাক্যাম্প ঢাবিতে। ঢাবি পল্টনে। ছাত্ররা লেখাপড়া করে এক বিষয়ে, কর্মজীবন কাটায় অন্য বিষয়ে। মন্ত্রীরা দায়িত্ব পায় এক বিষয়ে, কথা বলে অন্য বিষয়ে। অপরাধ করলেই শাস্তি পেতে হয় না, কিন্তু ভূলে কেউ শাস্তি পেলে তাকে অবশ্যই অপরাধী বানাতে হয়। আকাশের যত তারা, পুলিশের তত ধারা। বিনাবিচারে জেল-জরিমানা-রিমান্ডে সাজা, বিচারে সাজা হওয়ার পর রাষ্ট্রপতির ক্ষমা। বিচারকের ঘাটতি, উকিলের ছড়াছড়ি, এলাকায় আইন অজ্ঞরা বিচার করি। শিল্পকারখানা ধ্বংশ করতে বাধা নেই, সৃষ্টি করতে হাজারো বাধা। নারীদের প্রাপ্য উত্তরাধীকার সম্পদ আদায় করে দিতে না পারলেও, সমান অধিকারের নামে ভাই-বোনের মধ্যে দন্দ লাগিয়ে মেয়েদের বাপের বাড়ী যাওয়ার পথ বন্ধ করে দিচ্ছি। রাজনীতির নামে যারা কিছুই সৃষ্টি করতে পারিনা, তারাই ধ্বংশের ক্ষেত্রে মাহানায়ক। একের জন্য অন্যের শাস্তি। জাহেলী যুগের গোত্রীয় সংঘাতের মতই বর্তমান দলীয় সংঘাত। জীবিতদের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারি না, কিন্তু মৃতদের হাড্ডি নিয়ে টানাটানি করি। সাপকে ছেড়ে দিয়ে তার খোলস নিয়ে মাতামাতি করি। অপরিকল্পিত নগরায়ন ঠেকাতে কিছু করতে না পারলেও পরিকল্পিত নির্মান সম্পন্ন হওয়ার পর ভাঙ্গার জন্য তেড়ে আসি। ছেলেরা বেকার হলেও মেয়েদের উপর ঘরে-বাইরে দ্বিগুণ কাজের চাপ। কোটা প্রথায় যোগ্যরা অযোগ্য আর অযোগ্যরা যোগ্য। রাস্তায় নারীদের শরীর দেখাতে দোষ নেই, কিন্তু কাপড়ে ঢাকা পুরুষ তা দেখে বাহ্বা দিলেই দূষ। প্রেমের নামে অবৈধ গর্ভধারণে দূষ নেই, কিন্তু সে বয়সে বিয়ে করলে দূষ। এ সব অসঙ্গতির পশ্চাৎদেশে পদাঘাত করার জন্য “লিমনের একটি হারানো পা” যথেষ্ট নয় কি?

শুধুমাত্র  নেতা, দল, বা সরকার পরিবর্তন হলেই এ সব অসঙ্গতি দূর হবে না, যদি না নীতির পরিবর্তন হয়। নীতির পরিবর্তন করতে হবে ধর্মপ্রিয় অসাম্প্রদায়িক যুব সমাজকেই। কিন্তু তা কিভাবে সম্ভব হবে? আসুন, তা পর্যালোচনা করে দেখি।

লেখকঃ আহবায়ক, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান মুসলিম ঐক্য পরিষদ। ০১৮১৯ ৮৩৩২৩৫।

কোন মন্তব্য নেই: